বিসর্গতে_দুঃখ

দীর্ঘকাল আগে শাহাদুজ্জামানের ‘বিসর্গতে দুঃখ’ বইটির নাম শুনেছিলাম। বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০০৩ সালে শ্রাবণ প্রকাশনী থেকে। প্রথম সংস্করণ শেষ হয় অনেক আগে এবং তারপর আর কোন সংস্করণ বের হয় নি। তাই অপ্রাপ্যতার কারণে কেনা সম্ভব হয়নি। সম্প্রতি বাঙলায়ন বইটিকে পুনঃপ্রকাশ করায় সেই সুযোগ পাওয়া গেল।

বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর পত্রপত্রিকায় এ নিয়ে নানাবিধ আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে বইটির ব্যাতিক্রমী প্রকরণ নিয়ে মনোযোগী হয়েছেন অনেকেই। এটা গল্প, উপন্যাস না প্রবন্ধ এমন প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। তবে বইটিকে বিশেষ কোন তকমা পড়ানোর ব্যাপারে লেখকের আগ্রহ নেই। চেক লেখক মিলান কুন্ডেরা একটা ব্যক্তিগত ডিকশনারী লিখেছিলেন, যেখানে তিনি শব্দগুলোকে নিজের মত করে অর্থ করে নিয়েছিলেন। সেই বই থেকে শাহাদুজ্জামান অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন একটি ব্যক্তিগত বর্ণমালা বই লিখতে, যার নাম ‘বিসর্গতে দুঃখ’। এটাকে বড়দের বর্ণমালার বইও বলা যেতে পারে।

ছেলেবেলায় আমরা সবাই পড়েছি, অ-তে অজগর, আ-তে আম . . . . । শাহাদুজ্জামানের সৃষ্ট চরিত্র শফিকের জন্য (হয়তোবা নিজের জন্যও) তিনি ভিন্ন শব্দগুচ্ছের প্রস্তাবনা করেন, যার অ-তে ‘অন্যমনষ্কতা’, আ-তে ‘আকাশ’, ক-তে ‘কম্যুনিজম’, এ-তে ‘একাকীত্ব’, ছ-তে ‘ছলনা’, দ-তে ‘দ্বিধাদ্বন্দ্ব’, ন-তে ‘নীরবতা’, ম-তে ‘মুজিব’ এবং ‘মুক্তিযুদ্ধ’, ষ-তে ‘ষড়যন্ত্র’, র-তে ‘রাজনীতি’, অনুস্বার (ং)-এ ‘বিংশশতাব্দী’ এবং সর্বশেষ বিসর্গ (ঃ)-তে ‘দুঃখ’।

বর্ণমালার প্রত্যেকটি বর্ণের জন্য শফিকের উপযুক্ত একটি শব্দ এবং কেন সে শব্দটিই তার জীবনে মোক্ষম তার বর্ণনা করা হয়েছে প্রতিটি অধ্যায়ে। অধ্যায়গুলোর নাম তাই এক একটি বর্ণের নামে। মোট ৪৮টি ছোট ছোট অধ্যায়ের সমন্বয়ে বইটি।

শফিকের জীবন বর্ণনায় লেখকের বিস্তৃত পড়াশোনার পরিচয় পাওয়া যায়। ঢাকা শহরের বেকার যুবক শফিক। একদা সমাজতন্ত্রকে সামাজিক বিকাশের হাতিয়ার বলে মেনেছিল। জীবনের নানা অভিজ্ঞতার ফাঁদে পড়ে জীবনকে একটা লক্ষ্য দিতে পারেনি। যদিও নিজের রাজনৈতিক মতাদর্শ থেকে সরে আসে নি, তবুও নিজের যাপিত জীবন এবং শহরটি তার কাছে অচেনা লাগে। তার হিসেব মেলে না। না মেলানো হিসেবের পরই শফিক শেষে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, বিসর্গতে তার জন্য বরাদ্দ শব্দ হচ্ছে ‘দুঃখ’। ‘বিসর্গতে দুঃখ’ তাই বিষণ্নতার বয়ান।

শহীদুল জহির তার লেখক জীবনে একটি মাত্র গ্রন্থসমালোচনাই করেছিলেন এবং তা ‘বিসর্গতে দুঃখ’ বইটি নিয়ে। সেই লেখার শিরোনাম ‘বিসর্গতে দুঃখ কেন?’ লেখাটির ইতিহাসমূল্য বিবেচনায় বাঙলায়নের প্রকাশনায় সেই গ্রন্থসমালোচনাটিও যুক্ত করা হয়েছে।

শহীদুল জহির ‘বিসর্গতে দুঃখ কেন’র উত্তর খুঁজতে গিয়ে বলেছেন, ‘কারণ কি এই যে বিসর্গ দেখতেই চোখের পানির মতো? গুঁড়ো গুঁড়ো অশ্রুর মতো? কারণ কি এই যে জীবনের নদীতে সুখ ভেলা মাত্র, বাকিটুকু দুঃখ? হয়তো বা, হয়তো বা নয়।’

বইয়ের লেখক সম্পর্কে তার মূল্যায়ন, ‘শাহাদুজ্জামান সাহিত্যের জনপ্রিয় এবং পরিচিত পথে ভ্রমণ না করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, . . . . . . .এভাবে অন্য পথে হাঁটার সাহস এবং শক্তি তাঁর আছে। এ জন্য তাঁর মেধা এবং মননই দায়ী। হয়তো পাণ্ডিত্যও।’

শহীদুল জহির ‘বিসর্গতে দুঃখ’ বইটিকে বলেছিলেন মেটাফিকশন। মেটাফিকশনে হৃদয়ের তুলনায় মগজের এবং জ্ঞানের মিশেল অনেক বেশি থাকতে পারে, গল্প বলার তুলনায় বা বদলে গল্প না বলাই উপজীব্য হতে পারে বলেই শহীদুল জহির মনে করেন। ল্যাটিন আমেরিকান সাহিত্যিক হোর্হে লুই বোর্হেস, ভারতের অমিতাভ ঘোষ বিদেশী ভাষায় মেটাফিকশন লিখেছেন। ‘বিসর্গতে দুঃখ’ যদি সত্যিই মেটাফিকশন হয়ে থাকে তবে সেটা বাংলা ভাষায় প্রথম প্রচেষ্টাই হবে। শহীদুল জহির বলেন, ‘এটা একটা পরিভ্রমণ, আবেগজাত এবং আক্ষরিক, অভিজ্ঞতা, মেধা ও পাণ্ডিত্য লালিত, বর্ণ গন্ধ ও চিত্রময়’।

বিসর্গতে দুঃখ

https://bookshelvez.com//Attachments/BookCovers/57.jpg
https://bookshelvez.com//Attachments/BookCovers/57.jpg

বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর পত্রপত্রিকায় এ নিয়ে নানাবিধ আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে বইটির ব্যাতিক্রমী প্রকরণ নিয়ে মনোযোগী হয়েছেন অনেকেই। এটা গল্প, উপন্যাস না প্রবন্ধ এমন প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। তবে বইটিকে বিশেষ কোন তকমা পড়ানোর ব্যাপারে লেখকের আগ্রহ নেই। চেক লেখক মিলান কুন্ডেরা একটা ব্যক্তিগত ডিকশনারী লিখেছিলেন, যেখানে তিনি শব্দগুলোকে নিজের মত করে অর্থ করে নিয়েছিলেন। সেই বই থেকে শাহাদুজ্জামান অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন একটি ব্যক্তিগত বর্ণমালা বই লিখতে, যার নাম ‘বিসর্গতে দুঃখ’। এটাকে বড়দের বর্ণমালার বইও বলা যেতে পারে।

বিসর্গতে দুঃখ

https://bookshelvez.com//Attachments/BookCovers/57.jpg

Copyright © 2025 4i Inc. All rights reserved.