আখতারুজ্জামান_ইলিয়াসের_গল্পঃ_নিবিড়_পাঠ-_প্রথম_পর্ব_(মিলির_হাতে_স্টেনগান,_দুধভাতে_উৎপাত)

কথা ছিল আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে নিয়ে লিখব। কিন্তু লিখতে বসেই মনে হল তাঁর মতন একজন জায়ান্ট (আক্ষরিক অর্থেই) সাহিত্যিককে নিয়ে লেখা আর যাই হোক আমার মতন চুনোপুঁটির কম্ম নয়। হতে পারি আমি তাঁর একজন বড় ফ্যান, হতে পারে একজন লেখক বেঁচে থাকে তাঁর পাঠকদের মাঝে অনন্তকাল। কিন্তু সত্যিকার অর্থেই এমন একজনের, যে কিনা তাঁর লেখনীর চাইতেও বড়, তাঁর সম্পর্কে লিখতে গেলে আমার মতন একজন অপেশাদার এবং শুধুমাত্র ভক্তের লেখা আপন গতিতেই শ্লথ হয়ে পড়ে, কখনো বা থেমে যায় নিজের-ই অজান্তে। মাঝে মাঝে এই ভাবনাতেই আমার সময় থমকে দাঁড়ায়, “তিনি এই বাংলায় এসেছিলেন, এত বড় একজন জন্মেছিলেন এই বাংলায়”। তাঁর জন্মদিন চলে গেল বারোই ফেব্রুয়ারিতে, আমার জয়েন করা গ্রুপগুলোতে খুব কম আলোচনাই হয়েছে তাকে নিয়ে। মাঝে মাঝে অবাক হয়ে ভাবি ইলিয়াস কেন এত অপঠিত আমাদের কাছে, শুধুমাত্র কি তাঁর লেখনীর জন্য নাকি সাথে আমাদের পাঠকের অজ্ঞানতাও একইভাবে দায়ী এর জন্যে? আমরা যেন কোন কিছুই আর গভীরে যেয়ে দেখতে চাইনা কেবল একটি গল্প শুনতে চাই, কেবল সহজ আবেগমাখা একটি গল্পই; কিন্তু গল্প বলাও যে এক দুর্দান্ত আর্ট তা আমরা ইলিয়াসের মাঝেই পাই। আমাদের অন্তর্গত দ্বন্দ্বের এত তীব্র তীক্ষ্ণ বহিঃপ্রকাশ বাংলা ভাষায় এত সুন্দরভাবে মানিকের পর তিনি ছাড়া আর কে করেছেন?

ইলিয়াসের সমগ্র সাহিত্য নিয়ে লেখার দুঃসাহস করবো না। শুধুমাত্র একটা গল্প নিয়েই আলোচনা করবো। রিভিউ না, একে বলতে পারেন পাঠ পর্যালোচনা। বইপড়ুয়া’তে দেখলাম একজন “মিলির হাতে স্টেনগান” গল্পটি পড়ে উৎযাপন করছেন ইলিয়াসের জন্মোৎসব। তাই গল্প পর্যালোচনার এই অংশে ওই গল্পটি নিয়েই আলোচনা করলাম ( গল্পটি আমারও খুব প্রিয়, অবশ্য ইলিয়াসের কোন গল্পটি পছন্দের নয় তাও ভাববার বিষয়)।

ইলিয়াস লিখেছেন, “মধ্যবিত্ত সমাজের একটি বড়ো অংশ নিজেদের সামাজিক ও শ্রেণিগত অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত নয়”। অর্থাৎ সমাজের কোন স্তরে তাদের বাস তাই নিয়েই তারা মুহুর্মুহু দ্বিধায় দ্বিধান্বিত। গল্পের চরিত্রগুলোর দিকে তাকালে আমরা স্পষ্টতই সেই ব্যাপারগুলো দেখতে পাবো। মিলি, মিলির বাবা আশরাফ আলী, মিলির মা, মিলির বড় ভাই রানা এরা সবাই যেন সেই দ্বিধাযুক্ত অবস্থানের দোলায় দোল খাচ্ছে পুরো গল্প জুড়ে।

যুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশের এ এক নতুন চিত্র উঠে এসেছে ইলিয়াসের এই গল্পে। যেখানে মধ্যবিত্ত একটা অসচ্ছল পরিবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে ভিন্ন এক উপায়ে। এখানে আশরাফ আলীর সতত প্রবাহিত মূল্যবোধ ক্ষীণ গলায় আওয়াজ তোলে, মিলির মা’র মাতৃত্বের সকল আবেদন ঝুকে পড়ে বখে যাওয়া সন্তান রানার’র প্রতি যে কিনা এখন তাঁর পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতার কারণ, হোক না কেন তা ব্যাঙ্ক লুটের টাকায়। আর রানা যার শৈশব কৈশোর যৌবন নষ্ট হয়ে যায় এই উত্তাল সময়ে।

আব্বাস পাগলা এই গল্পের অন্যতম মুখ্য চরিত্র, বলা যায় গল্পের বিবেকস্বরূপ। সে একটা স্টেনগান চায় রানাদের কাছে, যার মাধ্যমে সে রাতভর চাঁদের পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে লুকিয়ে থাকা শত্রুদের মারতে পারে। রানারা তাকে স্টেনগান দেবার বদলে ভর্তি করিয়ে দেয় হাসপাতালে, যেখানেও সে অবিরাম শুনতে পায় শত্রুর চলাফেরার শব্দ।

মিলি এ স-ব কিছুরই দর্শক। তার সাথে আব্বাস পাগলার সম্পর্কের চঞ্চলতা উল্লেখযোগ্য ভাবে লক্ষণীয়। মিলি যেন বিশ্বাস করতে চায় সত্যি সত্যি চাঁদের ওপারে আছে শত্রুর ঘাঁটি, তারা লক্ষ্য রাখছে পৃথিবীর উপর কখন মোক্ষম অস্ত্রটি ফেলা যায় এখানে। আর একটা মাত্র একটা স্টেনগানেই গুড়িয়ে দিতে পারে সব কিছু বিশ-বাইশ বছর আগে বি এস সি ফেল করে একরামপুর স্কুলের “লাইকে মাস্টার” যুদ্ধ ফেরত আব্বাস পাগলা।

গল্পের শেষ অংশে আমরা জানতে পারি উপযুক্ত চিকিৎসার বদৌলতে সুস্থ হয়ে ফেরত আসে আব্বাস পাগলা তার মহল্লায়। আর ফের মিলির কাছে এসে রানার কাছে সেই স্টেনগান না চেয়ে, চায় রানাদের “ইন্ডেটিং ফার্মে” একটা চাকরী। কিন্তু মিলি যখন রানার ব্যাঙ্ক লুটের সময় কাজে লাগা (বর্তমানে লুকিয়ে রাখা) স্টেনগান এনে দেয় আব্বাস পাগলার সামনে তখন তার “ফিটফাট মুখ ঝুলে পড়ে, একরঙা মুখে বিড়বিড় করতে করতে বলে- মিলি আমি না ভালো হইয়া গেছি। তুমি বোঝো না? আমার ব্যারাম ভালো হইয়া গেছি”। তখন স্পষ্টতই আমরা ইলিয়াসের ব্যাঙ্গোক্তি লক্ষ্য করি।এইখানে ইলিয়াস ব্যঙ্গ করেছেন মূল সমাজ ব্যবস্থাকে। যে সমাজ ব্যবস্থায় অর্থকেই প্রাধান্য দিয়ে এসেছে আগে এবং পরে, কখনো জানতে চায়নি এই অর্থ প্রাপ্তির উৎসকে। ভালো হয়ে যাওয়া মানে কি তাহলে এই, নিজস্ব বিশ্বাস এবং মূল্যবোধকে বিসর্জন দিয়ে অর্থের পেছনে ছোঁটা? ভালো হওয়া বলতে তবে কি বোঝায়?

গল্পের আঙ্গিক গঠন ও শব্দশৈলী অসাধারণ। আঞ্চলিক শব্দের উপর্যুক্ত ব্যবহার এখানেও লক্ষ্য করা যায়, যা ইলিয়াসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আর সাথে ইলিয়াসের হিউমারের ব্যবহার আপনাকে আনন্দ দেবে। মিলির কল্পনা-স্বপ্ন–বাস্তব আর আব্বাস পাগলার উক্তি ইলিয়াসের অসাধারণ লেখনীর দ্বারা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে প্রতিটা লাইনে লাইনে। মাঝে মাঝেই পাঠককে ছাঁকনি নিয়ে বসতে হবে বইয়ের পৃষ্ঠায় কল্পনা আর বাস্তবের মিশেলকে আলাদা করার জন্যে। তবে গল্পের শেষে তা ইলিয়াসের মতনই অনন্য মনে হবে আর তার রেশ রয়ে যাবে ইলিয়াসের আরেকটা গল্প পাঠের আগ পর্যন্ত।

কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস-এর সকল সাহিত্যকর্ম পাঠ হোক সকলের কাছে আনন্দময়।

ধন্যবাদ সবাইকে।

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্পঃ নিবিড় পাঠ- প্রথম পর্ব (মিলির হাতে স্টেনগান, দুধভাতে উৎপাত)

https://bookshelvez.com//Attachments/BookCovers/1023.jpg
https://bookshelvez.com//Attachments/BookCovers/1023.jpg

কথা ছিল আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে নিয়ে লিখব। কিন্তু লিখতে বসেই মনে হল তাঁর মতন একজন জায়ান্ট (আক্ষরিক অর্থেই) সাহিত্যিককে নিয়ে লেখা আর যাই হোক আমার মতন চুনোপুঁটির কম্ম নয়। হতে পারি আমি তাঁর একজন বড় ফ্যান, হতে পারে একজন লেখক বেঁচে থাকে তাঁর পাঠকদের মাঝে অনন্তকাল। কিন্তু সত্যিকার অর্থেই এমন একজনের, যে কিনা তাঁর লেখনীর চাইতেও বড়, তাঁর সম্পর্কে লিখতে গেলে আমার মতন একজন অপেশাদার এবং শুধুমাত্র ভক্তের লেখা আপন গতিতেই শ্লথ হয়ে পড়ে, কখনো বা থেমে যায় নিজের-ই অজান্তে। মাঝে মাঝে এই ভাবনাতেই আমার সময় থমকে দাঁড়ায়, “তিনি এই বাংলায় এসেছিলেন, এত বড় একজন জন্মেছিলেন এই বাংলায়”। তাঁর জন্মদিন চলে গেল বারোই ফেব্রুয়ারিতে, আমার জয়েন করা গ্রুপগুলোতে খুব কম আলোচনাই হয়েছে তাকে নিয়ে। মাঝে মাঝে অবাক হয়ে ভাবি ইলিয়াস কেন এত অপঠিত আমাদের কাছে, শুধুমাত্র কি তাঁর লেখনীর জন্য নাকি সাথে আমাদের পাঠকের অজ্ঞানতাও একইভাবে দায়ী এর জন্যে? আমরা যেন কোন কিছুই আর গভীরে যেয়ে দেখতে চাইনা কেবল একটি গল্প শুনতে চাই, কেবল সহজ আবেগমাখা একটি গল্পই; কিন্তু গল্প বলাও যে এক দুর্দান্ত আর্ট তা আমরা ইলিয়াসের মাঝেই পাই। আমাদের অন্তর্গত দ্বন্দ্বের এত তীব্র তীক্ষ্ণ বহিঃপ্রকাশ বাংলা ভাষায় এত সুন্দরভাবে মানিকের পর তিনি ছাড়া আর কে করেছেন?

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্পঃ নিবিড় পাঠ- প্রথম পর্ব (মিলির হাতে স্টেনগান, দুধভাতে উৎপাত)

https://bookshelvez.com//Attachments/BookCovers/1023.jpg

Copyright © 2026 4i Inc. All rights reserved.