শহীদুল_জহিরের_নির্বাচিত_উপন্যাস

গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে পড়েছিলাম শহীদুল জহিরের অসামান্য উপন্যাস, "সে রাতে পূর্ণিমা ছিল"। পড়ার পর এক ঘোরগ্রস্ত অবস্থায় লিখেছিলাম, "এরকম স্বপ্ন স্বপ্ন উপন্যাস কিভাবে লিখতে পারে একজন মানুষ? কীভাবে লেখা সম্ভব এইরকম আস্ত একটা উপন্যাস স্বপ্নের ভেতর দিয়ে?" সেইসময় আরো লিখেছিলাম, "আগামী এক সপ্তাহ আমি একনাগাড়ে এই একটিমাত্র উপন্যাসই পড়ব!" আমি আমার কথা রেখেছিলাম। সেই সময়ে লেখা কতকগুলো চিন্তন-কণাকে একসাথে বাঁধা যাক এইবার…

*

শহীদুল জহিরের "সে রাতে পূর্ণিমা ছিল" উপন্যাসটিকে নানাজন নানাভাবে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করেছেন। অনেকে একে বলেছেন সামাজিক উপন্যাস, কেউ কেউ একে আবার রাজনৈতিক উপন্যাস হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন আবার কেউ কেউ দেখলাম এই উপন্যাসটিকে প্রকৃষ্ট মানের থ্রিলার হিসেবেও অভিহিত করেছেন। অথচ তিনদিন ধরে ক্রমাগত পাঠের পর আমার কাছে মনে হয়েছে এই উপন্যাসটি আগাগোড়াই একটি প্রেমের উপন্যাস। 

*

ভূমিহীন কৃষক আকালুর সন্তান মফিজুদ্দিন যখন আলী আসগর মিয়ার একমাত্র কন্যা চন্দ্রভানকে প্রথম দেখার পরপরই ঘোষণা দেয় যে এই মেয়েকেই সে বিয়ে করবে তখন এই উপন্যাসটিকে আমার মনে হয় এক পাগল প্রেমিকের উপাখ্যান যে কিনা এক নারীর জন্যে সব কিছু করতে রাজী আছে! 

*

মোবারক আলি জোলার একমাত্র মেয়ে দুলালি যখন রাতের অন্ধকারে হারিকেন জ্বালিয়ে দুরু দুরু বুকের শিহরণ লুকিয়ে নিজের স্কুলের খাতার এক কোণায় লেখে, "নাসির ভাই, তোমাক খুব দেইখপ্যার ইচ্ছা কইরত্যাছে" আর তারপর এইসব চিরকুট যখন সে ছড়িয়ে দেয় সমগ্র সুহাসিনী গ্রামে শিউলি ফুলের মতন তখন কার বলার সাধ্য থাকে যে এ প্রেমের উপন্যাস নয়?

*

রফিকুল ইসলাম নামের সরল এক গ্রাম্য কিশোরের মৃত্যুতে যখন থানার ইউএনও সাহেবের ওমন চৌকষ বুদ্ধিদীপ্তের অধিকারিণী মেয়ে জান্নাত আরা তার অদ্ভুত আধার জড়ানো মুখের রহস্যময় শোক আর শৈত্য এবং একইসাথে ফ্রকের উপরের অংশে নরম বাঁকানো চাঁদের মতো প্রকাশিত ক্ষীণ ভাজের উত্তাপ ছড়িয়ে উচ্চ নিনাদ করে গ্রাম্য মেয়েদের মতো কাঁদতে থাকে তখন তো এই উপন্যাসকে প্রেমের উপন্যাস বলেই সন্দেহ হয় আমার! 

*

আবার যুদ্ধ শেষে যখন আবুবকর সিদ্দিক বাড়ির ঘাটে নেমে এসে যখন আলেকজানের মুখের দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত ভালোলাগায় আচ্ছন্ন হয়ে উচ্চৈস্বরে বলে, ভালো আছিস তুই, আলেকজান? তখন আলেকজানের চোখে বিষণ্ণতার অশ্রু দেখে আবুবকর সিদ্দিক হয়ে যায় গ্রামের সিদ্দিক মাস্টার তখন তো মনে হতেই পারে এ এক অসামান্য প্রেমের উপন্যাস! 

*

পুরো উপন্যাস জুড়ে এত এত প্রেমের অনুষঙ্গ ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকার পরেও যখন কারো তা নজরে আসে না, তখন আমার কেবলই মনে হয়, 'এ কেমন ভ্রান্তি আমার!'…

*

আমার কাছে মনে হয়, শহীদুল জহিরের লেখার ক্ষেত্রে ঘটনাটা মুখ্য নয়, বরঞ্চ ঘটনাটা কীভাবে ঘটেছিল তাই মুখ্য ব্যাপার হয়ে ওঠে। 

*

শহীদুল জহিরের "সে রাতে পূর্ণিমা ছিল" উপন্যাসের দ্বিতীয় লাইনেই লেখক লিখে ফেলেন উপন্যাসের প্রধানতম ঘটনাটি, একেবারে আচমকাই, খুবই সাধারণ ভাবে, "আততায়ীদের হাতে ভাদ্র মাসের এক মেঘহীন পূর্ণিমা রাতে সুহাসিনীর মফিজুদ্দিন মিয়া সপরিবারে নিহত হওয়ার পরদিন, গ্রামবাসীদের কেউ কেউ মহির সরকারের বাড়ির প্রাঙ্গনে এসে জড়ো হয়।" এই যে উপন্যাসের প্রধান ঘটনাটি এত নিরাসক্ত আর নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে লেখক লেখেন যে এটাই হয়ে যায় শহীদুল জহিরের লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

*

মনে পড়ে একবার তলস্তয়ের "আনা কারেনিনা"র রিভিউ লিখতে গিয়ে লিখে ফেলেছিলাম আনার মৃত্যুর কথা। তাই পড়ে একজন রেগে মেগে আগুন! কেন আমি এই জিনিস বলে দিলাম! উপন্যাস পড়ার বারোটা বাজালাম, এটা প্রকৃতপক্ষেই একটা স্পয়লার। অথচ তাকে আমি বোঝাতেই পারলাম না, আনার মৃত্যু উপন্যাসে বড় ব্যাপার নয়, বড় ব্যাপার হচ্ছে কেন সে মরে! আমি তাকে এও বলেছিলাম, আমি যেদিন থেকে আনা কারেনিনার নাম জানি সেদিন থেকে জানি যে আনা কারেনিনা মৃত। তাও আমার পড়তে অসুবিধে হয় নি। তারপরেও সে নাছোরবান্দা! কিন্তু এখন এই শহীদুল জহিরের ব্যাপারে কী করবে খুব জানতে ইচ্ছে হয়…

*

"সে রাতে পূর্ণিমা ছিল" উপন্যাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হচ্ছে দুলালি! অথচ এই দুলালির কথা প্রথম লেখার সাথে সাথেই লেখক আমাদের জানিয়ে দেন যে, এই মেয়েটির বিয়ে হওয়ার আগেই মারা যাবেন। আমরা তাতে অবাক হই না, আমরা খুঁজতে থাকি তখন এই দুলালির মৃত্যুর কারণ। এইভাবে লেখক শহীদুল জহির ঘটনার ঘনঘটায় যে সাসপেন্স থাকে তা ভেঙে দেন। আনেন নতুন এক ধারা! 

*

বলাই বাহুল্য মার্কেজের স্টাইলটা ঠিক একইরকম। কিন্তু মার্কেজ থেকে শহীদুল জহির স্বতন্ত্র হয়ে যান এই জায়গায় এসে যখন শহীদুল জহির একই কথার পুনরাবৃত্তি করেন অথচ পাঠকের বিরক্তি উতপাদন করেন না। এইখানেই শহীদুল জহির হয়ে পড়েন বিশিষ্ট একজন। 

*

এইরকম আরেকটা উপন্যাস পড়েছিলাম যেখানে ঘটনা প্রধান নয়, বরঞ্চ কীভাবে ঘটেছিল সেই ঘটনা সেটাই মুখ্য। উপন্যাসটার নাম, "স্লামডগ মিলিয়নেয়ার"। অদ্ভুত সুন্দর একটা উপন্যাস। মন্ত্রমুগ্ধের মতন পড়ে গিয়েছিলাম সেই উপন্যাসটি। সেখানেও ঠিক একই ব্যাপার ঘটে। উত্তরটা প্রধান নয়, উত্তরটা নায়ক কিভাবে জানল সেটাই বড় ব্যাপার, সেটাই বইয়ের প্রধান আকর্ষণ। 

*

আরো একটা অদ্ভুত ব্যাপার বলতে চাই। স্লামডগ মিলিয়নেয়ার এর লেখক একজন আমলা। বিকাশ স্বরূপ। আমাদের শহীদুল জহিরও ছিলেন তাই।

*

উপন্যাসটি পড়তে যেয়ে খেয়াল করি উপন্যাসে মোট নারী চরিত্র ছয়টি। এবং এরা প্রত্যেকেই জোড়ায় জোড়ায় নিজেদের বৈশিষ্ট্যে বিশিষ্ট! যেমন বলা যায়, নয়নতারা আর চন্দ্রভানের কথা। এই দুই নারীকে আমার বলিষ্ঠ চরিত্রের মনে হয়েছে, দুজনেই পুরুষ সমাজকে পদানত করেছে, একজন কাম-কলার চৌষট্টি রীতির প্রয়োগ ঘটিয়ে অপরজন বছরের পর বছর নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে যে গর্ভবতী হওয়া সেই রীতির বিরুদ্ধে লাইগেশন করিয়ে। আবার আকালুর বোবা স্ত্রী আর আলেকজানের কথাই ধরা যাক। এরা দুজনেই যেন ছায়াময়, ভীষণ রকমের নির্লিপ্ত, অসহ্যরকমের নীরব। মাঠের ভেতর পাওয়া এক মেয়েকে আকালু বাড়িতে নিয়ে আসে, তাকে বড় করে, আচমকাই শোনা যায় সে গর্ভবতী হয়ে পড়েছে! তবুও সে নীরব। নীরবে আসা আবার নীরবেই প্রস্থান যেন। একইভাবে আলেকজানকে আমরা দেখি সবকিছুতেই ভীষণভাবে নির্লিপ্ত! পুরো উপন্যাসে তাকেও কোনো কথা বলতে দেখা যায় না! এরকম জোড়ায় জোড়ায় একই বৈশিষ্ট্যের নারী চরিত্র নির্মাণের আলাদা কী কোনো কারণ আছে? 

*

উপন্যাসটি আমি পড়েছি শহীদুল জহিরের "নির্বাচিত উপন্যাস" নামক সংকলন থেকে। এই বই আলাদা করে পাবার আশা একধরনের দুরাশাই বটে। তাই এই নির্বাচিত সংকলনটাই কেনা মনে হচ্ছে লাভজনক! বইটা প্রকাশ করেছে পাঠকের কল্লাকাটা প্রকাশনী, পাঠক সমাবেশ! তবে কেন জানি মনে হয়েছে এই বইতে দয়াপরবশ হয়েই তারা বইয়ের দাম সাধ্যের মধ্যে রেখেছে, অর্থাৎ ২৭৫ টাকা। অকল্পনীয় ব্যাপার-স্যাপার যাকে বলে আর কি! 

শহীদুল জহিরের নির্বাচিত উপন্যাস

https://bookshelvez.com//Attachments/BookCovers/971.jpg
https://bookshelvez.com//Attachments/BookCovers/971.jpg

শহীদুল জহিরের "সে রাতে পূর্ণিমা ছিল" উপন্যাসের দ্বিতীয় লাইনেই লেখক লিখে ফেলেন উপন্যাসের প্রধানতম ঘটনাটি, একেবারে আচমকাই, খুবই সাধারণ ভাবে, "আততায়ীদের হাতে ভাদ্র মাসের এক মেঘহীন পূর্ণিমা রাতে সুহাসিনীর মফিজুদ্দিন মিয়া সপরিবারে নিহত হওয়ার পরদিন, গ্রামবাসীদের কেউ কেউ মহির সরকারের বাড়ির প্রাঙ্গনে এসে জড়ো হয়।" এই যে উপন্যাসের প্রধান ঘটনাটি এত নিরাসক্ত আর নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে লেখক লেখেন যে এটাই হয়ে যায় শহীদুল জহিরের লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

শহীদুল জহিরের নির্বাচিত উপন্যাস

https://bookshelvez.com//Attachments/BookCovers/971.jpg

Copyright © 2025 4i Inc. All rights reserved.