সমরেশ_মজুমদারের_“গীতবিতান_ছুঁয়ে_বলছি”

এক চাচাতো বোন যখন আমার হাতে বইটা তুলে দিচ্ছিল তখন অপর চাচাতো বোন পাশ থেকে বলেছিল, “এই বই যে ওকে দিচ্ছিস, ও কি এই বই বুঝতে পারবে? আর এই বই পড়ার মতন কি ওর বয়স হয়েছে?” বই হাতে দিতে দিতে চাচাতো বোনটি তখন বলেছিল, “আমি এই বই ক্লাস এইটে থাকতে পড়েছিলাম। আমি বুঝতে পারলে ও বুঝতে পারবে না কেন?” আমার উপর বিশ্বাস রাখার জন্য চাচাতো বোনকে ধন্যবাদ। আমি যে শুধু বইটা পড়ে বুঝেইছিলাম তা নয়, এক পর্যায়ে আমি জয়িতার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। আর প্রেমে পড়ার জন্যেই কিনা জানি না জয়িতার নেয়া অইরকম সিদ্ধান্তটি সেই বয়সে কখনোই মেনে নিতে পারিনি। এক প্রবল বিরাগ জন্মেছিল সেই বয়সে জয়িতার উপরে। এই রকম একটা কাজ জয়িতা কীভাবে করতে পারল? পাঁড় পাঠকেরা নিশ্চয়ই এতক্ষণে বুঝে গিয়েছেন আমি কোন বইয়ের কথা বলছি।


হ্যাঁ, “গর্ভধারিণী”-ই ছিল আমার পড়া সমরেশ মজুমদারের প্রথম কোন বই। এবং কলকাতার লেখকদের ইয়া ব্বড় গাবদা গাবদা সাইজের বই পড়ার হাতে খড়ি হয় এই সমরেশ মজুমদার দিয়েই। “উত্তরাধিকার”, “কালবেলা” না পড়ে আমি প্রথমে পড়েছিলাম “কালপুরুষ”। কাহিনী বুঝতে একটু সমস্যা হয়েছিল বৈকি তারপরেও শান্ত, ধীরস্থির আর ছিমছাম অনিমেষের চাইতে আমার বেশি পছন্দ হয়েছিল রগচটা, এলোমেলো অর্ককে। “অগ্নিরথ”, “আট কুঠুরি নয় দরজা”, “সাতকাহন”, আর বেশ কিছু রহস্য উপন্যাস পড়ার পর বহুদিন আর সমরেশ মজুমদারের বই পড়া হয়নি। আমার বরাবরই কেন জানি মনে হত সমরেশ মজুমদার তার উপন্যাসের শেষ করা নিয়ে বিষম বিপাকে পড়ে যান। কি থেকে কি করবেন বুঝতে না পেরে একটা গোঁজামিল দিয়ে উপন্যাস হুট করে শেষ করে দিয়েই সেই বিপাক থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। 

“মৌষলকাল” প্রকাশের পর দারুণ একটা হাইপ উঠেছিল, দুই বাংলাতেই। আর উঠবে নাই-বা কেন দীর্ঘ ত্রিশ বচ্ছর পর বাঙালীর অতি প্রিয় চরিত্রগুলোকে আবার উপন্যাসের পাতায় নিয়ে আসছেন তিনি, শোরগোল তো পড়বেই। কিন্তু সেই বই পড়ে অপরাপর বাঙালীর মতন আমিও হতাশ হয়েছিলাম। পড়ার পর মনে হচ্ছিল না পড়লেই বুঝি ভালো করতাম। যাই হোক, অনেকদিন পর আবার সমরেশ মজুমদারের কোন বই পড়া হল। সেই বইটি হল “গীতবিতান ছুঁয়ে বলছি”। 

“গীতবিতান ছুঁয়ে বলছি” মূলত কলাম সংকলন। লেখক “প্রতিদিন” নামক পত্রিকায় নিয়ম করে যে কলামগুলো লিখতেন সেগুলোরই প্রকাশিত রূপ এই বই। ভারতবর্ষের আদালতে হিন্দু সাক্ষীকে গীতা ছুঁয়ে শপথ করতে হয় যে তিনি কোন মিথ্যা সাক্ষ্য দেবেন না। অন্যান্য বাঙালীর মতন তারও ধর্ম বিশ্বাস এমন প্রবল নয় যে গীতকাকে তিনি এখন আর এমন মহামূল্যবান গ্রন্থ বলে মনে করেন। তার চাইতে সুখে দুঃখে অনেক বেশি প্রিয় রবীন্দ্রনাথের “গীতবিতান” বইটি। তাই তিনি গীতবিতান ছুঁয়েই বলতে চান তার এই লেখার মাঝে কোন ভাঁওতাবাজি নেই। যা লিখেছেন সেগুলো তার অন্তরের কথা।

“গীতবিতান ছুঁয়ে বলছি” কলামের অধিকাংশ লেখাই আত্মজৈবনিক বললে অত্যুক্তি হবে না। অনেকাংশ জুড়ে রয়েছে ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ, প্রাত্যহিক জীবনে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনার বয়ান, লেখালেখি এবং লেখক সমাজের অবস্থান, বর্তমানের কার্যকলাপের সাথে পুরাতন আচার-আচরণগুলো মিলিয়ে দেখার প্রবণতা, বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনার প্রতিক্রিয়া (যদিও এই বিষয় নিয়ে আলাপচারিতা খুবই কম উঠে এসেছে লেখায়), এপার বাঙলা ওপার বাঙলার মানুষের মিল এবং তফাৎ, বাঙালির বিবর্তন, বিদেশে বাঙালিদের অবস্থান ইত্যাদি ইত্যাদি বিষয়। 

মূলত আমি বইটা কিনেছিলাম বইয়ের শুরুর দিককার কিছু লেখা পড়ে। লেখকের বই পড়ার জগতটা কীভাবে গড়ে উঠছিল (অবশ্যই গজদাঁত বিশিষ্ট কোন মেয়ের দ্বারা, এইখানে বলে রাখা ভালো, লেখক যেখানেই যান সেখানেই গজদাঁতওয়ালা মেয়ের দেখা পান) সেই নিয়েই লেখা ছিল সেখানে। আমি ভেবেছিলাম পুরোটা বই জুড়েই হয়তো তাই রয়েছে। কিন্তু পরবর্তীতে আবিষ্কার করলাম, ব্যাপারটা মোটেও তা নয়। লেখক গল্প করেছেন নানা বিষয় নিয়ে। চাইলে প্রত্যেকটা কলাম ধরেই আলোচনা করা যায়। কিন্তু এখানে এত বিস্তারিত আলাপ করার সুযোগ কোথায়?

হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর পর সমরেশ মজুমদারের একটা লেখা ফেসবুকে বেশ ঝড় তুলেছিল। সেই লেখাটা এখানে পেলাম। হুমায়ূন আহমেদের কোন একটা বইয়ে এমনটা পড়েছিলাম যে “দেশ” পত্রিকার লোক তার ঘরে এসে বসে আছে লেখার জন্য, তিনি দিতে পারছেন না। আবার সমরেশ মজুমদারের এই বইতে পড়লাম হুমায়ূন আহমেদ কেমন নাঁকি নাঁকি সুরে তার কাছে আবদার করেছিল যেন একটা লেখা ছাপা হয় “দেশ” পত্রিকায় এবং সমরেশ মজুমদার সেই সুযোগটা পাইয়ে দিয়েছিলেন হুমায়ূন আহমেদকে। এখন কে যে সত্যি কথা বলছে তা আর বোঝার উপায় নেই। 

বাংলাদেশ নিয়ে বেশ কতকগুলো লেখা লিখেছেন তিনি। গত সাতাশ বছর ধরে নিয়মতি বাংলাদেশে আসছেন লেখক। ততটা নিবিড়ভাবে হয়তো দেখার সুযোগ হয়নি এই দেশকে। তবুও যতটুকু দেখেছেন তার ছবি তুলে ধরতে চেয়েছেন লেখায়। এই দেশের মানুষের ভাষা নিয়ে, ধর্ম নিয়ে, সাহিত্য নিয়ে বিভিন্ন আবেগকে বর্ণনা করার চেষ্টা করেছেন। 

ফরম্যাট মেপে মেপে যেহেতু প্রত্যেকটি লেখা লিখতে হয়েছে তাই দেখা গেছে সমরেশ মজুমদারকে অনেক কথাই সারতে হয়েছে সংক্ষেপে। এক একটা লেখা যেখানে অনেক বড় লেখার দাবী করে সেখানেও দুই পাতাতেই কাজ সেরেছেন তিনি। আর লেখার মানের কথা বললে বলতে হয়, আমি বেশ হতাশ। এত বড় লেখকের ভাষায় কোন কারুকাজ নাই, নেই কোন মাধুর্য। পড়ার সময় মনে হচ্ছিল কোন এলেবেলে লোকের ফেসবুকের লেখা পড়ছি। কারণ যেভাবে তিনি “হোটেল ইয়ং বেঙ্গল” আর তার মালিকের নাম ধরে প্রশংসা করেছেন তাতে এমনটা মনে হওয়া স্বাভাবিক। আবার নিজের বইয়ের প্রচার বেশ ভালো রকমেই করেছেন তিনি এইসব লেখায়। নতুনদের লেখালেখির কথা উঠলেই তিনি প্রচেত গুপ্তর নাম করেন। প্রচেত গুপ্তকে এতটা ফ্লোর কেন দিলেন বোঝা গেল না। অথচ যতটা জানি, প্রচেত গুপ্ত লেখায় ভালোরকমের অনুকরণ করেন হুমায়ূন আহমেদকে। 

বইটা এখনও শেষ করতে পারিনি। বেশ কয়েক জায়গায় একই লেখার এবং একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হওয়ায় বেশ ঢিমেতালাই পড়া হচ্ছে। তবে শুরুর দিককার লেখা পড়ার জন্যে সবাইকে আমন্ত্রণ জানানোই যেতে পারে। 

সবাইকে তাই বইটি পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম।

সমরেশ মজুমদারের “গীতবিতান ছুঁয়ে বলছি”

https://bookshelvez.com//Attachments/BookCovers/1049.jpg
https://bookshelvez.com//Attachments/BookCovers/1049.jpg

এক চাচাতো বোন যখন আমার হাতে বইটা তুলে দিচ্ছিল তখন অপর চাচাতো বোন পাশ থেকে বলেছিল, “এই বই যে ওকে দিচ্ছিস, ও কি এই বই বুঝতে পারবে? আর এই বই পড়ার মতন কি ওর বয়স হয়েছে?” বই হাতে দিতে দিতে চাচাতো বোনটি তখন বলেছিল, “আমি এই বই ক্লাস এইটে থাকতে পড়েছিলাম। আমি বুঝতে পারলে ও বুঝতে পারবে না কেন?” আমার উপর বিশ্বাস রাখার জন্য চাচাতো বোনকে ধন্যবাদ। আমি যে শুধু বইটা পড়ে বুঝেইছিলাম তা নয়, এক পর্যায়ে আমি জয়িতার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। আর প্রেমে পড়ার জন্যেই কিনা জানি না জয়িতার নেয়া অইরকম সিদ্ধান্তটি সেই বয়সে কখনোই মেনে নিতে পারিনি। এক প্রবল বিরাগ জন্মেছিল সেই বয়সে জয়িতার উপরে। এই রকম একটা কাজ জয়িতা কীভাবে করতে পারল? পাঁড় পাঠকেরা নিশ্চয়ই এতক্ষণে বুঝে গিয়েছেন আমি কোন বইয়ের কথা বলছি।

সমরেশ মজুমদারের “গীতবিতান ছুঁয়ে বলছি”

https://bookshelvez.com//Attachments/BookCovers/1049.jpg

Copyright © 2025 4i Inc. All rights reserved.