“দ্বিতীয়_সত্তার_সন্ধানে”_আমি_এবং_আমরা

বইপড়া মানুষজন দেখতে ভালো লাগে, তাঁদের সাথে বই নিয়ে কথা বলায় একধরনের স্বর্গীয় সুখানুভূতি লাভ করি আমি। কৈশোরকাল গ্রামে কাটানোর দরুন আমার পক্ষে সে সময় বইপড়ুয়া মানুষজনের দেখা পাওয়া ছিল দুষ্কর। মাইলের পর মাইল আমার চারপাশ ছিল লাইব্রেরীহীন। একটাও লাইব্রেরী নেই, চিন্তা করা যায়? পড়া বইগুলো বারবার পড়তাম। মাঝে মাঝে চাচাতো ভাইবোনেরা শহর থেকে গ্রামে আসত, বেড়াতে।

তখন শীতকাল; মাঘের এক রাতে আমরা সব ভাই বোনেরা মিলে আমাদের বাড়ির সামনের বিশাল চন্দ্রালোকিত ফসল কাটা মাঠে হেটে বেড়ালাম। বড় আপা আমাদের শোনালো সিনডেরেলার গল্প। আমরা ছোটরা সে গল্প হা করে শোনার পর তাঁকে ধরলাম আরও গল্প বলার জন্য, কিন্তু বড় আপা বলল- তোদের মেঝ আপাকে গিয়ে ধর সে আরও অনেক গল্প জানে। কিন্তু মেঝ আপা তখন হ্যারিকেনের আলোয় এক বিশাল গাবদা বইয়ের মাঝে মুখ লুকিয়ে আছে। অদ্ভুত সে বইয়ের প্রচ্ছদ। পুরোটা কালো রঙের, মাঝের দিকে মানুষের একটা ছবি কেবল তাতে। মাথায় কেমন এক কাপড় বাঁধা, মানুষটার শারীরিক গঠন দেখে বোঝার উপায় নেই সে পুরুষ না মহিলা। বাইয়ের নাম জিজ্ঞেস করাতে মেঝ আপা উত্তর দিল- “পার্থিব”। লেখকের নাম শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়।

সেই আমার প্রথম তাঁর নাম শোনা। পড়া তারও অনেক পরে। শীর্ষেন্দুর প্রথম বই আমার সেই “পার্থিব”-ই। ভাবতাম আপারা এতো পড়ত তাঁর এই বই, দেখিই না পড়ে কেমন লাগে। প্রথম বই পড়ে আমি কেবলই মুগ্ধ আর মুগ্ধ এবং মুগ্ধ। মনে হল এই লেখকের সব বই পড়া দরকার। আমার পছন্দের লেখকে পরিণত হলেন তিনি। একে একে অনেকগুলো বই পড়ে ফেললাম। কিন্তু খেয়াল করে দেখলাম, শীর্ষেন্দুর সব বইই কেমন যেন রূপকথার মত। রাজা রানীর কন্যা হল, কন্যার জীবনে দুঃখ এলো এরপরে এক রাজপুত্র এসে সে দুঃখ নাশ করল এবং তারা সুখে শান্তিতে বাস করতে লাগল। অর্থাৎ জিতিয়ে দেয়া, প্রধান চরিত্রদের বা ভালো মানুষদের যে কোন উপায়েই জিতিয়ে দেয়ার এই যে এক প্রবণতা সেটা শীর্ষেন্দুর লেখায় খুব প্রকট হয়ে দেখা দেয়ায় এক সময় মনে হল তিনি এমনটি না করলেও পারতেন। বাস্তবতা হয়তো সব সময় এমন হয় না, খুব ভালো মানুষও তো হেরে যান জীবনযুদ্ধে; তিনি তো বাস্তবতা দেখাচ্ছেন না। ঠিক এমনি এক পর্যায়ে এসে আমি পড়লাম শীর্ষেন্দুর “মানবজমিন” উপন্যাসটি। আমার কল্পনায় গড়া ধারণা যেন মুহূর্তেই ধ্বসে পড়ল। এভাবে এতো নিরেট বাস্তবতার কথা আমি এর আগে তাঁর অন্য কোন লেখায় দেখিনি। এতো তীক্ষ্ণ ভাবে লেখা হয় নি তাঁর আর কোন উপন্যাস। পড়তে গেলে চারপাশের মানুষের প্রতি একধরনের ঘৃণা জন্মে। মানুষ কি সত্যিই এই বইয়ের মতন? মানুষ তো এরকম না তাহলে কেন লিখলেন তিনি? নাকি আমাদের দেখায় ভুল থেকে গিয়েছিল আগাগোড়াই? মুখোশের অন্তরালের যে জমিন অপ্রকাশ্য তাই হয়তো মানবজমিন। আমরা তাঁর কতটুকুই বা জানি? এই কারণেই “মানবজমিন” আমার পড়া সেরা দশটি বাংলা উপন্যাসের মধ্যে স্থান করে নেয়।

কিন্তু সেদিন গ্রুপে এই বই নিয়ে বেশ দীর্ঘ আলোচনা চলছিল। এবং লক্ষ্য করে দেখলাম এই উপন্যাসকে কেউই ভালো বলছে না- সবার কাছেই বোরিং লেগেছে, সবার কাছেই ফালতু লেগেছে, সবার কাছেই এই উপন্যাসের চরিত্রগুলোকে অবাস্তব মনে হয়েছে। চরিত্রগুলো হৃদয়হীন হতে পারে কিন্তু কখনোই আমার কাছে অবাস্তব মনে হয় নি। সবচে অবাক হয়েছি আমি কিছু পাঁড় শীর্ষেন্দুর পাঠকদের কমেন্ট দেখে, তাদেরও নাকি এই উপন্যাসটি ভালো লাগে নি। একটু দুঃখ পেলাম। শীর্ষেন্দু আমার পছন্দের লেখক আর “মানবজমিন” আমার পড়া অন্যতম সেরা উপন্যাস; পাঠক হিসেবে আমি তাই আমার যুক্তিগুলো তুলে ধরার ব্যর্থ চেষ্টা চালালাম। কোন লাভ হল বলে মনে হল না, তবে আমার বেশ লাভ হল সেই আলোচনা আগাগোড়া পড়ায়। অনেকগুলো বইয়ের নাম জানতে পারলাম, যেসব বই অন্য শীর্ষেন্দু পাঠকদের ভালো লেগেছে। “দ্বিতীয় সত্তার সন্ধানে” নামটি সেখান থেকেই পাওয়া, বইটি পরে দারুণ ভালো লাগল।

একবার এক পোস্টে উল্লেখ করেছিলাম যেসব লেখক বিস্তৃত উপন্যাস লিখে অভ্যস্ত বা তাঁদের সেই বিশাল ব্যাপ্তির উপন্যাস পড়ে পাঠক অভ্যস্ত সেইসব লেখকদের ছোট ছোট উপন্যাস পড়ে পাঠকরা বরাবরই হতাশ হয়। সমরেশ মজুমদার, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, বিমল মিত্র, তিলোত্তমা মজুমদারের নাম এক্ষেত্রে উল্লেখ করা যায়। কিন্তু শীর্ষেন্দুর এই ছোট ছোট উপন্যাসের মাঝে এক ধরনের সম্পূর্ণতার আভাস পেলাম আমি। কাহিনী গুলো খুবই সাধারণ, কিন্তু চরিত্র গঠনে বেশ শক্তিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন তিনি। যা পড়তে গেলে ভালো লাগে। তবে শীর্ষেন্দু তাঁর উপন্যাসে বড় বেশি অতিরিক্ত চরিত্র তৈরি করেন, যা উপন্যাসে প্রয়োজনই থাকে না। দেখা গেল তিন ভাইয়ের কথা লিখেছেন কিন্তু দুই ভাইয়ের কথা বলেই উপন্যাস শেষ, তাহলে তৃতীয় ভাইটার উল্লেখ করার কি দরকার ছিল সেখানে? এইরকম চরিত্র এই বইতেও আছে।

কিছু একটা ফেলে এসেছি, কি যেন সাথে নেই, কিছু একটা বলতে হবে কিন্তু ভুলে বসে আছি, কোথাও যেতে হবে কিন্তু জায়গাটার নাম ঠিক মনে করতে পারছি না। এমনটা কিন্তু আমাদের সবারই হয় । ঠিক সবার না বলে আলাভোলা ধরণের মানুষের কথাই ধরা যাক। পরীক্ষার হলে সব নিয়ে গেছি কিন্তু ক্যালকুলেটর নেবার কথা বেমালুম ভুলে বসে আছি। এইরকম সময় আমাদের মনে হয় আহারে কেউ যদি থাকত যে আমাদের মনে করিয়ে দেবে এইসব কথা। আবার আমরা কি রকম তা কি আমরা জানি? আচ্ছা আমরা কীভাবে হাঁটি? কীভাবে কথা বলার সময় মুখ নাড়াই, হাত নাড়াই? এসব কি আমরা বুঝতে পারি? আয়নার মধ্যে আসল আমি কে কি কখনও দেখা সম্ভব? এসব জানতে গেলে একজনকে দরকার যে আমারই কিন্তু আলাদা এক সত্তা। আমারই মাঝে আরেক আমি। একটা দ্বিতীয় সত্তা থাকলে বোধ হয় ভালোই হয়। যে মনে করিয়ে দেবে আমাদের এই করো, এটা করো, এই করো না। সাথে নেই কিন্তু আবার ঠিক নেই হয়েও আছে। ঠিক এই কথাগুলোই দাড়িয়ে দাড়িয়ে ভাবছিল দর্শনের শিক্ষক মধুকর। আর অমনি পাশ দিয়ে হুস করে বেড়িয়ে গেল কলেজে যাবার গাড়িটা। কলেজে এসে কলিগকে এই কথা বলতেই কলিগ বলে উঠল- “হুম বিয়ে করতে হবে তোমায়। বিয়ে করো এরপর বউই তোমায় সব মনে করিয়ে দেবে। কিন্তু মধুকর তো বিয়ে করতে চায় নি, তাহলে? ফিজিক্সের শিক্ষক বললেন- “ঈশ্বর, ঐ দ্বিতীয় সত্তাই হলেন আমাদের ঈশ্বর। সব সময় পাশে থাকেন কিন্তু টের পাওয়া যায় না। তাকে খুঁজতে হবে। কিন্তু না, ঠিক তাকেও চাইছে না মধুকর। বাসে বসে নিরালায় ভাবার সময় চোখ পড়ল দূরে বসা এক মেয়ের দিকে, সাথে সাথে যেন জীবন তীরে ঢেউ লাগল একরাশ মিষ্টি স্মৃতির, মনে হল, এ কে? এর সাথে কোথাও যেন দেখা হয়েছিল, বড় পরিচিত সে মুখ। কিন্তু মনে করতে পারছে না তাকে। উঠে দাড়িয়ে সামনে আসতে চেয়েও পিছিয়ে পড়ল মধুকর। মেয়েটি এভাবে তাকিয়ে হাসছে কেন? মেয়েটি কে?

মেয়েটির নাম ছিল বিষ্ণুপ্রিয়া। জীবন চলছিল তাঁর হেসে খেলে। ছোটবেলা থেকেই পাশের বাড়ি ছেলেটিকে তাঁর বর জেনে এসেছে সে। কিন্তু একটা ঘটনায় মুহূর্তের মধ্যে সব পাল্টে গেল।

পৃথিবীতে যত ধরণের অপরাধ আছে, আমি ব্যক্তিগত ভাবে সবচে বড় এবং ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ মনে করি ধর্ষণকে। এটা যে কি পরিমাণ দুঃখ দেয় আমাকে আমি তা বলে বোঝাতে পারব না। অথচ দেখুন, ধর্ষিতা মেয়েকেই সবচে বেশি অপমানিত হতে হয় সমাজে, যেন সে নিজের ইচ্ছায় ধর্ষিতা হয়েছে। দিব্যেন্দু পালিত-এর একটা গল্প আছে “ধর্ষণের পরে”, সে গল্প পরে আমি চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। এতটাই নির্মম ছিল সে গল্প। আমি মনে করি ধর্ষকের সাজা কেবল মৃত্যুদণ্ড দিলেই হবে না এমন শাস্তি দিতে হবে যাতে সে মৃত্যুর পরেও শান্তি না পায়।

বিষ্ণুপ্রিয়ার তাই এখন জীবনের একটি মাত্র লক্ষ্য, মৃত্যুর আগে একজন ধর্ষকের জীবন হলেও সে নিয়ে যাবে। ব্যক্তিগত এক ক্রোধে সব সময় জ্বলছে বিষ্ণুপ্রিয়া, শান্তি নেই, নিস্তার নেই সেই ক্রোধ থেকে। আর “মানুষ তো ব্যক্তিগত ভাবেই বাঁচে, ব্যক্তিগতভাবেই পৃথিবীকে নেয়। যতক্ষন সে আছে ততক্ষণই পৃথিবী। সে যেই লুপ্ত হবে অমনি পৃথিবীও তার কাছে শেষ”। কিন্তু তবু এক শান্তির পরশ হাওয়া বয়ে যায় তাঁর সে অশান্ত মনের দুয়ারে এসে যখন চিন্তা করে এক রাতের বাস ভ্রমনের কথা। এক অদ্ভুৎ লোক এসে দাঁড়িয়েছিল সেদিন সামনে এসে। কিছু একটা বলতে চেয়েছিল, কি বলতে চেয়েছিল???

দুটি মানুষের জীবন কাহিনী নিয়ে গড়ে উঠেছে এই “দ্বিতীয় সত্তার সন্ধানে” উপন্যাসটি। দুজনেই দুজনকে খুঁজছে, হয়তো এই খোঁজা সব মানুষের সব সময় সফল হয় না। অনেকেই হারিয়ে ফেলে। ঠিক দ্বিতীয় সত্তা না পেলেও মানিয়ে নেয় অন্য একজনকে। আবার কেউ কেউ তো পায়।

মাঝে মাঝে রূপকথা পড়ার জন্যেও তো আমরা ঠাকুরমার ঝুলি খুলে বসি, তাই নয় কি?

“দ্বিতীয় সত্তার সন্ধানে” আমি এবং আমরা

https://bookshelvez.com//Attachments/BookCovers/1035.jpg
https://bookshelvez.com//Attachments/BookCovers/1035.jpg

তখন শীতকাল; মাঘের এক রাতে আমরা সব ভাই বোনেরা মিলে আমাদের বাড়ির সামনের বিশাল চন্দ্রালোকিত ফসল কাটা মাঠে হেটে বেড়ালাম। বড় আপা আমাদের শোনালো সিনডেরেলার গল্প। আমরা ছোটরা সে গল্প হা করে শোনার পর তাঁকে ধরলাম আরও গল্প বলার জন্য, কিন্তু বড় আপা বলল- তোদের মেঝ আপাকে গিয়ে ধর সে আরও অনেক গল্প জানে। কিন্তু মেঝ আপা তখন হ্যারিকেনের আলোয় এক বিশাল গাবদা বইয়ের মাঝে মুখ লুকিয়ে আছে। অদ্ভুত সে বইয়ের প্রচ্ছদ। পুরোটা কালো রঙের, মাঝের দিকে মানুষের একটা ছবি কেবল তাতে। মাথায় কেমন এক কাপড় বাঁধা, মানুষটার শারীরিক গঠন দেখে বোঝার উপায় নেই সে পুরুষ না মহিলা। বাইয়ের নাম জিজ্ঞেস করাতে মেঝ আপা উত্তর দিল- “পার্থিব”। লেখকের নাম শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়।

“দ্বিতীয় সত্তার সন্ধানে” আমি এবং আমরা

https://bookshelvez.com//Attachments/BookCovers/1035.jpg

Copyright © 2025 4i Inc. All rights reserved.