মাহমুদুল_হকের_“কালো_বরফ”_এবং_আমার_স্মৃতিকাতরতা

ইয়াসমিন আমার চেয়ে দুই বছররের বড় ছিল তবুও আমি ইয়াসমিনকে কখনো “আপা” ডাকি নি, শুধু “ইয়াসমিন” বলেই ডাকতাম। কারণটা ছিল খুব সোজা, ও আর আমি একই ক্লাসে পড়তাম। একই ক্লাসে পড়া সহপাঠিনীকে কি কখনও “আপা” ডাকা যায়? হোক না সে যতই চাচাতো বড় বোন।

মাঘের চাদর জড়ানো এমনই এক শীতের রাতে, কুয়াশায় সিক্ত কাঠের জানালায় হাত রেখে কড়া নাড়ে ইয়াসমিন, “এই, ওঠ ওঠ, চল, ভূত দাবড়ায়ে আসি”। আমি তখন সদ্য শহর ফেরত কিশোর, ভূত দাবড়ানোর কিইবা জানি? তবু অজানাকে জানার মোহে, ঘুমের আলস্য ছেড়ে, লেপের তলা থেকে কাঁপতে কাঁপতে বের হয়ে দেখি, উঠোনের বিশাল আমগাছের পাশে দয়া করে বেড়ে ওঠা কুল বরইয়ের গাছের নিচে জমায়েত হয়েছে নানা বয়সের সব ছেলেমেয়ে। সবার গায়েই শীতের পোশাক, কেউ পড়েছে তখনকার দিনের তথাকথিত জাম্পার, কেউ বা জ্যাকেট, মেয়েরা পড়েছে কার্ডিগান, কেউবা চাদর আর একেবারেই যারা দরিদ্র তারা বাপের ছেঁড়া লুঙ্গিটা গিঁট দিয়েছে গলায়। হি হি করে কাঁপতে কাঁপতে আমি তখন জিজ্ঞাসা করি- এরপর?

আপনারা কেউ যদি কখনো আমাদের বাড়িতে যান তাহলে দেখতে পাবেন সরকারি রাস্তা থেকেও আমাদের বাড়ি দেখা যায়। সেই রাস্তার একেবারে সামনের বাড়ি ছিল রুস্তম খাঁদের। সেই বাড়ির সামনে ছিল এক মরা হিজল গাছ। গিয়ে দেখি আরও ছেলেমেয়ে অনেক আগেই জমায়েত হয়ে আছে সেখানে। গাছটিকে ঘিরে গোল হয়ে দাড়িয়ে ঊর্ধ্বমুখে তাকিয়ে রয়েছে সবাই স্থাণুর মতন, যেন বোধহীন। বেশ স্থির একটি চিত্র। কেমন পরাবস্তব মনে হয় দৃশ্যটিকে। এরইমধ্যে সেই নিস্তব্ধতাকে কাচের চুড়ির মতন খানখান করে ভেঙে দিয়ে আমাদের এক বড় ভাই বলে ওঠে, “এই গাছেই, হ্যাঁ এই গাছেই আছে সেই শাকচুন্নি।” বলতে না বলতেই আগুন ধরানো সারা। ছুঁড়ে মারা হল আগুনের কুণ্ডলী। গাছের গোড়াতে পড়তেই লকলকিয়ে উঠল আগুনের শিখা। সবার মাঝে আগুন লাগানোর হিড়িক পড়ে গেল। কেউ একজন টায়ার জ্বালিয়ে দিয়ে গেল ধুলোর রাস্তায়, সূর্যের মতন জ্বলতে লাগল তা সমস্ত ভোর।
শীতের রাত তখন শেষ হয় হয়। সূর্য তখনও মোল্লা বাড়ির উপরে ওঠেনি, অত বড় যে সূর্য তার রশ্মিগুলো এখনও তাই ও বাড়ির পেছনেই আছে। সেই আলোতেই আমরা ভাইবোনেরা হরিন্দারার মাঠে নীল মটরশুঁটি আর হলুদ সরিষার ক্ষেতের আল বেয়ে বাড়ির দিকে হাঁটা দিলাম। 

ভূত দাবড়ানোর এই রীতি আমাদের এলাকায় “গাস্সি” নামে পরিচিত। আমি কখনোই “গাস্সি”র সঠিক দিন তারিখ মনে রাখতে পারতাম না। তবে আমার চাচাতো ভাই বোনেরা ঠিকই মনে রাখত। আমি শুধু জানতাম এমনই কোন এক মাঘের রাতে আমার স্বপ্নের ভেতর থেকে ঘুম ঘুম স্বরে ডেকে উঠত আমার চাচাতো বোন, ইয়াসমিন।
আমি সেসব দিনরাত্রি পেছনে ফেলে এসেছি। শহরে এসে আমি ভুলে গিয়েছিলাম সেইসব বিগত দিনের উষ্ণতা আর রাত্রির শীতলতা। বাড়ির পিছনে যে মস্ত বড় জঙ্গলে ভর দুপুরে ডাহুক ডেকে উঠত আমি সেই ডাহুকের ডাক পেছনে ফেলে চলে এসেছি এই ইট কংক্রিটের পাথুরে হৃদয় ভরা মানুষের শহরে। আবিল এক যান্ত্রিকতায় যেখানে রৌদ্রের দুপুরে নিষ্পেষিত হয় একেকটা দিন কেমন যন্ত্রণায়, হাহাকারে। আমি সেই শহরে চলে এসেছি, ভুলে গেছি সবকিছু। তবু কোনো এক রাতে মাহমুদুল হকের “কালো বরফ” পড়তে পড়তে হু হু করে কেঁদে উঠি। আমার আবার মনে পড়ে যায় ইয়াসমিনের কথা, মনে পড়ে যায় শীতের রাতে বোনদের সাথে জ্যোৎস্নায় মাঠময় ঘুরে বেড়ানোর কথা, মনে পড়ে যায় সেই সব কথা যা আমি মনে থেকে মুছে ফেলেছি অনেক আগে। অনেক অনেক আগে স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে মাহমুদুল হক এক নিজস্ব স্বরে আলাদা হয়ে আছেন। তার রচনার পরিমাণ অপ্রতুল। খুব অল্প লিখেও যেসব লেখক পাঠকচিত্তে তুলেছেন চিন্তার তরঙ্গ মাহমুদুল হক তাদের অন্যতম। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তার প্রশংসা করতে গিয়ে লিখেছিলেন- “বাংলা গদ্যে প্রভুত্ব করার ক্ষমতা এর আছে।”
মাহমুদুল হকের উপন্যাসের প্রধান বৈশিষ্ট্যই হল সাধারণ মানুষের জীবনকে দেখানো। সেইসব সাধারণ মানুষ, যারা কোনো বড় ঘটনার কোনো অংশই নয়, অথচ বড় ঘটনা যে একটি সাধারণ মানুষের জীবনকে তছনছ করে দেয়ার সামর্থ্য রাখে তাই বুঝি বারবার দেখাতে চেয়েছেন কথাসাহিত্যিক মাহমুদুল হক তার লেখা উপন্যাসগুলোতে।
“কালো বরফ”-এও আমরা দেখি যে দেশভাগ, হিন্দু মুসলমান সম্পর্ক কোথাও তেমন দানা বাঁধে না, অথচ শেষ পর্যন্ত এই দেশ ভাগই এক স্থায়ী প্রভাব ফেলে উপন্যাসের প্রধান চরিত্র আবদুল খালেকের উপর। সে আর তার শৈশবের পোকা’র জীবনের কাছে ফিরে যেতে পারে না, দেশ ভাগের সাথে সাথে যে একটি মানুষের স্মৃতিকেও রাজনীতিবিদরা দু ভাগ করে ফেলেন তা বুঝি কোনো নেতা কখনো বুঝতে পারবেন না।

মাহমুদুল হক নিজেও ছিলেন এই ছেঁড়া-স্মৃতির মানুষ। দেশভাগের উত্তাল সময়ে তাকে জন্মভূমি বারাসত ছেড়ে চলে আসতে হয় ঢাকায়। এই ঘটনার অভিজ্ঞতা তার সাহিত্য সৃষ্টিতেও ব্যাপক প্রভাবিত করেছে। এই বিচ্ছিন্নতা থেকে সৃষ্ট নিঃসঙ্গতা তার উপন্যাসে সঞ্চারিত হয়েছে ভিন্ন ব্যঞ্জনায়। “কালো বরফ”-এর প্রধান চরিত্র আবদুল খালেকের মাঝে আমরা সেই বেদনারই হয়তো বহিঃপ্রকাশ ঘটতে দেখি।

উপন্যাসটি দুই ভাগে বিভক্ত। একভাগে রয়েছে আবদুল খালেক, যে কিনা মফস্বলের শিগগিরই-বন্ধ-হয়ে-যাওয়ার-পথে এমন এক কলেজে শিক্ষকতা করে, তার নিরুদ্যম জীবনের কথা। অপর ভাগে রয়েছে পোকার জীবন, যার রয়েছে সব কিছুকেই এক অপার বিস্ময় নিয়ে দেখার চোখ, তার আনন্দময় রঙিন শৈশবের গল্প। 

“তখন আমার অভ্যেস ছিল আঙুল চোষার। কখনো পুকুর-ঘাটে, কখনো বারান্দার সিঁড়িতে, কখনো বা জানালায় একা একা বসে কেবলই আঙুল চুষতাম। আঙুলের নোনতা স্বাদ যে খুব ভালো লাগত, ঠিক সে রকম কোন ব্যাপার নয়। তখন ভালো লাগা বা মন্দ লাগা এসবের কোন ঝক্কি ছিল, যতোটুকু মনে পড়ে; পৃথিবী যে গোল, এ কথা শুনে কানমাথা রীতিমতো ঝাঁ ঝাঁ করতো।”

উপন্যাসের মাঝপথে এসে জানা যায় আবদুল খালেকের ডাক নাম পোকা। কিন্তু কেন আবদুল খালেকের জীবনের সাথে পোকার এই বিচ্ছিন্নতা? কেন মনে হয় পোকার জীবন আর আবদুল খালেকের জীবন দূরবর্তী কোনো দ্বীপ, যারা এখনও আবিষ্কার করে নি একে অপরকে?

প্রতিরাতে আবদুল খালেক এক ঘোরের মাঝে শুনতে পায় নৈশব্দের ডাক। আর এরকম করেই- “যা কিছু নিঃশব্দ, যা কিছু শব্দময়, যা কিছু দৃশ্যগোচর, দৃশ্যাতীত, সব কিছুই একজোট হয়ে হাত ধরাধরি করে ঘিরে ধরে; অদ্ভুত এক বাজনার তালে তালে আস্ত একটি রাত মোমের মতো গলে পড়ে, জিনজার-হিনজার জিনজার-গিনজার জিনজার হিনজার পোকা শোনে, শুনতে পায়। পোকা পোকা হয়ে যায়।”

আবদুল খালেকের এই ভাবের জগতে চলে যাওয়া, উচ্চাকাঙ্ক্ষাহীনতাকে ভীষণ অপছন্দ করে স্ত্রী রেখা। মাহমুদুল হকের লেখায় প্রায়ই আমরা একটি জিনিস লক্ষ্য করি তা হল তার উপন্যাসের স্ত্রীরা স্বামীর ব্যাপারে বেশ বিরক্ত, তাকে হেয় করে দেখার একটি মানসিকতাও কখনো কখনো দেখা যায়। তবে মাহমুদুল হক প্রতিবারই এর পেছনে একটি যৌক্তিক ব্যাখ্যা দাড় করান। এবারেও তার ব্যতিক্রম করেন নি। আমরা জানতে পারি, রেখা মামার সংসারে মানুষ হওয়ার ফলে সব কিছুতেই সে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। স্বামীর এই আকস্মিক উদাসীনতাকে বুঝতে না পেরে কখনো সে তাকে তিরস্কার করে, কখনো বা সন্দেহ। কিন্তু আবদুল খালেকের মন পোকার কাছে ফিরে যাওয়ার পেছনে যে ব্যাকুলতা তার নাগাল কখনোই পায় না রেখা। 

“কালো বরফ”কে আমার কাছে মনে হয়েছে প্রেমের উপন্যাস। ফেলে আসা স্মৃতির প্রতি প্রেম, রেখে আসা দেশ নামক সত্তার প্রতি প্রেম, সবসময় “ইশটাইলিশ” বলে ক্ষেপানো হত যে মেয়েটিকে সেই মেয়েটি হঠাৎ নারী হয়ে গেলে সেই নারীরূপের প্রতি প্রেম, আর সর্বোপরি শৈশবের সেইসব বোকা বোকা দিনগুলির প্রতি এক অব্যক্ত প্রেমের উচ্চকন্ঠের প্রকাশ দেখি উপন্যাসটির পাতায় পাতায়। তখন কালো বরফকে শুধুই এক দেশভাগের অপরিসীম যন্ত্রণার উপন্যাস বলে মনে হয় না, “কালো বরফ” তার চাইতেও অধিক কিছু হয়ে ধরা দেয় আমার কাছে।
যে নদী আবদুল খালেকের স্মৃতিকে বিভক্ত করে দিয়েছে, সেই নদী বরাবর যেতে যেতে যখন সে বলে- “তারাপাশা তোকে আমি মারবো, ভাগ্যকুল তোকে আমি মারবো, নদী তোকে আমি মারবো, শেষ মারা আর শেষ হয় না কিছুতেই-” তখন তো একে প্রেমের উপন্যাস বলেই বোধ হয়। আবার মনি ভাইজান যখন ছবিদির কাছে ছুটে যায় পোকাকে নিয়ে। যখন ভিখারির সুরে বলে, “আমাকে কিছু দাও ছবি, আমাকে কিছু দাও।” তখন একে প্রেমের উপন্যাস বলেই ভ্রম হয় আমার। তখন আমার স্মরণে আসে নাম ভুলে যাওয়া এক অখ্যাত প্রাচীন কবির এক শ্লোক, সেও এভাবে চেয়েছিল প্রেমিকার কাছে একটা কিছু। মনি ভাইজানের কথায় অনুরণন তোলে তার সেই পঙক্তিগুলো-
“একটা কিছু তো দিয়ে যাও/ আমার নিদারুণ শুষ্ক বুকে তোমার নগ্ন শরীরে ছায়া/ ভীষণ দহনে দগ্ধ পিঠে আমার, দিয়ে যাও তোমার ঐ দশটি নখের গাঢ় আঁচড়/ কিছু না দিয়ে গেলে দেখাবো কি করে ঐ রাত্রির আকাশকে,/ অমাবস্যায় চিৎকার করে/ কিভাবে জানাব তাকে-/ দ্যাখো ও আকাশ, তুমি কত নিঃসঙ্গ আর আমি কত সুখী/ ভালবেসেছিল একদিন সে আমায়/ এই দ্যাখো ফেলে যাওয়া তার সেই স্মৃতি।” 
“এইভাবে সবকিছু একদিন গল্প হয়ে যায়।

জামার পকেটে ফিতে, ফিতেয় চুলের গন্ধ, যে গন্ধে অনেক দুঃখ, যে দুঃখে অনেক ভালোবাসা, যে ভালবাসায় অনেক ছেলেবেলা

এইভাবে সবকিছু একদিন গল্প হয়ে যায়।”

সবাইকে ধন্যবাদ।

মাহমুদুল হকের “কালো বরফ” এবং আমার স্মৃতিকাতরতা

https://bookshelvez.com//Attachments/BookCovers/969.jpg
https://bookshelvez.com//Attachments/BookCovers/969.jpg

ইয়াসমিন আমার চেয়ে দুই বছররের বড় ছিল তবুও আমি ইয়াসমিনকে কখনো “আপা” ডাকি নি, শুধু “ইয়াসমিন” বলেই ডাকতাম। কারণটা ছিল খুব সোজা, ও আর আমি একই ক্লাসে পড়তাম। একই ক্লাসে পড়া সহপাঠিনীকে কি কখনও “আপা” ডাকা যায়? হোক না সে যতই চাচাতো বড় বোন।

মাহমুদুল হকের “কালো বরফ” এবং আমার স্মৃতিকাতরতা

https://bookshelvez.com//Attachments/BookCovers/969.jpg

Copyright © 2025 4i Inc. All rights reserved.