বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় একদা বলে গিয়েছিলেন, “যদি মনে এমন বুঝিতে পারেন যে, লিখিয়া দেশের ও মনুষ্যজাতির কিছু মঙ্গল সাধন করিতে পারেন, অথবা সৌন্দর্য সৃষ্টি করিতে পারেন, তবে অবশ্য লিখিবেন।” বঙ্কিমচন্দ্রের কথা শিরোধার্য করে রাজশেখর বসু যে তার কলম ধরেছিলেন এমন কথা কোথাও শোনা না গেলেও তার রচনায় সেই মনুষ্যজাতির কিংবা দেশের মঙ্গল সাধন দেখতে পাওয়া যায়। তাই তো তার প্রতিটি রস-গল্পগুলো যেন নির্মল হাস্যরসের আড়ালে আমাদের সকল ব্যক্তিগত অসাধুতা, ধর্মীয় কুসংস্কার এবং সামাজিক ভণ্ডামির উপর পরশুরামের কুঠারের মতই আঘাত হানে। আমরা হাসিতে ভেঙে পড়ি ঠিকই কিন্তু একই সাথে একটু যেন কম্পিতও হই।
রাজশেখর বসু কে ছিলেন তার পরিচিতি দিতে গেলে বিশাল লিস্ট করতে হয়। তিনি ছিলেন একাধারে ছোটগল্পকার, ভাষাবিজ্ঞানী, অভিধান-সংকলক, অনুবাদক, রসায়নবিদ, সফল শিল্প-ব্যবস্থাপক এবং কবিও। এতকিছুর পরেও তার সর্বপ্রধান পরিচয় হয়ে উঠে এসেছে হাস্যরস স্রষ্টা হিসেবে। তবে গুরুগম্ভীর, রাশভারী লোকটি নিজের গাম্ভীর্য বজায় রাখতেই কিনা জানি না লেখায় পিতৃপ্রদত্ত নামটি ব্যবহার করতে চাননি, তাই এইসব হাস্যরসাত্মক লেখায় ব্যবহার করেছিলেন “পরশুরাম” নামটি, যা কিনা ছিল তার পরিচিত এক মিষ্টির দোকানের কর্মচারীর।
পরশুরাম যে আদতে একজন রসায়নবিদই ছিলেন তারও প্রমাণ মেলে নানাবিধ গল্পে। যেমন “ভুশণ্ডির মাঠে” গল্পটি ভৌতিক হওয়ার পরেও শিবু ভট্টাচার্যের মৃত্যুর কারণে তিনি কিন্তু ঠিকই রসায়নের কেরামতি দর্শিয়েছেন। নিজের স্ত্রীর মৃত্যু কামনা করে কালীঘাটে হত্যে দিয়ে আসার পর শিবুর খাবারের মেন্যুটার দিকে একটু নজর দেয়া যাক।
“মন্দির হইতে ফিরিয়া শিবু বড় এক ঠোঙা তেলেভাজা খাবার, আধ সের দই, এবং আধ সের অমৃতি খাইল। তারপর সমস্ত দিন জন্তুর বাগান, জাদুঘর, হগ সাহেবের বাজার, হাইকোর্ট ইত্যাদি দেখিয়া সন্ধ্যাবেলা বীডল স্ট্রিটের হোটেল-ডি-অর্থোডোক্সে এক প্লেট কারি, দু প্লেট রোস্ট ফাউল এবং আতখানা ডেভিল জলযোগ করিল।”
ব্যাপারখানা বোঝা গেল কি?
কিছু কিছু গল্প আছে যার হাস্যরসের আবেদন কখনো ফুরাবার মতন নয়। এই যেমন টেনিদার “পেশোয়ার কী আমির” যতবার পড়ি ততবারই হাসি, যদিও এই গল্প প্রায় মুখস্থ আমার, সিকোয়েন্স বাই সিকোয়েন্স মনে থাকার পরেও টেনিদার কীর্তি পড়তে গেলেই হাসি পায়। ঠিক এই রকমই একটা গল্প হল “গড্ডলিকা”র “চিকিৎসা-সংকট”। আমি গ্যারিন্টি দিয়ে বলতে পারি এই গল্প পড়ে সুকুমারের রামগরুড়ের ছানারাও হেসেছিল।
“...তারিণী। ভারী ব্যামো হয়েছিল কখনও?
নন্দ। অনেক দিন আগে টাইফয়েড হয়েছিল।
তারিণী। ঠিক ঠাউরেচি। পাঁচ বছর আগে?
নন্দ। প্রায় সাড়ে সাত বছর হ’ল।
তারিণী। একই কথা, পাঁচ দেরা সারে সাত। প্রাতিক্কালে বোমি হয়?
নন্দ। আজ্ঞে না।
তারিণী। হয়, যানতি পার না। নিদ্রা হয়?
নন্দ। ভালো হয় না।
তারিণী। হবেই না তো । উর্ধু হয়েছে কিনা। দাঁত কনকন করে?
নন্দ। আজ্ঞে না।
তারিণী। করে, যানতি পার না। যা হোক, তুমি চিন্তা কোরো না, বাবা। আরাম হয়ে যাবেনে। আমি ওষুধ দিচ্চি।”
একটি দুইটি গল্প আগে পড়া হলেও এইবার সবগুলো গল্প পড়া হল। পড়েই মনে হচ্ছে, এইবার পরশুরামের গল্পসমগ্র না কিনলে আর চলছে না।
পরশুরামের “গড্ডলিকা”
Mehedie Hassan https://bookshelvez.com//Attachments/BookCovers/1051.jpgবঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় একদা বলে গিয়েছিলেন, “যদি মনে এমন বুঝিতে পারেন যে, লিখিয়া দেশের ও মনুষ্যজাতির কিছু মঙ্গল সাধন করিতে পারেন, অথবা সৌন্দর্য সৃষ্টি করিতে পারেন, তবে অবশ্য লিখিবেন।” বঙ্কিমচন্দ্রের কথা শিরোধার্য করে রাজশেখর বসু যে তার কলম ধরেছিলেন এমন কথা কোথাও শোনা না গেলেও তার রচনায় সেই মনুষ্যজাতির কিংবা দেশের মঙ্গল সাধন দেখতে পাওয়া যায়। তাই তো তার প্রতিটি রস-গল্পগুলো যেন নির্মল হাস্যরসের আড়ালে আমাদের সকল ব্যক্তিগত অসাধুতা, ধর্মীয় কুসংস্কার এবং সামাজিক ভণ্ডামির উপর পরশুরামের কুঠারের মতই আঘাত হানে। আমরা হাসিতে ভেঙে পড়ি ঠিকই কিন্তু একই সাথে একটু যেন কম্পিতও হই।
পরশুরামের “গড্ডলিকা”
https://bookshelvez.com//Attachments/BookCovers/1051.jpg