কথায় আছে, লোহা গরম থাকতেই হাতুড়ি মারতে হয়। আমিও সেই একই নিয়ম অনুসরণ করে তাওয়া গরম থাকা অবস্থাতেই পরোটা ভেজে ফেললাম অর্থাৎ বই পড়ে শেষ করার সাথে সাথেই বই নিয়ে আলোচনায় চলে গেলাম মানে লিখতে বসলাম আর কি।
তখনও আমি ফেসবুকের কোন বইপড়ুয়া গ্রুপের সাথে যুক্ত ছিলাম না, হয়তো তখন তেমন কোন জনপ্রিয় ফেসবুকের গ্রুপও ছিল না। “মানুষ তো ব্যক্তিগত ভাবেই বাঁচে, আমি নেই তো দুনিয়াও নেই আমি আছি তো দুনিয়ার সকল কিছু আছে” (দ্বিতীয় সত্তার সন্ধানে, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়)। তখন বই পড়ি নিজের মনে, নেই তেমন কোনও বইপড়ুয়া বন্ধুও যাকে বলতে পারি সেই সব আশ্চর্য জগতের কথা যা বইয়ের মাঝে লুকিয়ে ছিল এতদিন আর আমি ধরতেই আমার সামনে মেলে দিল তার অজানা রহস্য। একা একা সেই রহস্য আবিস্কার আর কাউকে না বলতে পারার এক বুক অসহ্য বেদনা পুষে বেড়াই কেবল।
থ্রিলার পড়তে শুরু করেছি তারও বেশ আগে। অবশ্যই সেটা অনুবাদ, ইংলিশ বই ধরার দুঃসাহস করিনি তখনও। পড়তে শুরু করলাম জেমস প্যাটারসন, সিডনি শেলডনের বইগুলো। অনুবাদক কে? সেই অনীশ দাস অপু। আস্তে আস্তে নজরে এল মারিও পুজো’র “গডফাদার”। “বইয়ের আলোয় আলোকিত হন” আর বাতিঘরের সেই অপরিচিত সাদা লাইটের মতন লোগোটা মনের মধ্যে গেঁথে গেল এক নিমিষেই। এরপরে পেলাম ড্যান ব্রাউনকে। একের পর এক পড়ে যেতে লাগলাম মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিনের অনুবাদে বিশ্বসাহিত্যের সেরা সেরা থ্রিলার বইগুলো।
ততদিনে আমার ফেসবুক আকাউন্ট খোলা হয়ে গেছে, রাত জেগে পাহারা দেই সবার ওয়াল। এরপরেই খেয়াল করলাম বইয়ের ফ্ল্যাপে মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিনের মেইল এড্রেস দেয়া আছে। আর যায় কই? পাকড়াও এখনি, পাঠাও ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট। মনে ক্ষীণ সন্দেহ ছিল একসেপ্ট না হওয়ার কিন্তু রাত পোহানোর সাথে সাথেই দেখি ছোট্ট এক টুকরো নীল আলোর মতন আমার নোটিফিকেশনে জ্বলজ্বল করছে- ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট এক্সেপ্টেড। আমি তো প্রথমে মনে করেছিলাম লেখক মানুষ হয়তো কথাই বলবেন না, কারণ জাফর ইকবাল বলে গেছেন লেখকের লেখা পড়ে ভালো লাগলেই যে তার সাথে কথা বলে সুখ পাওয়া যাবে এমন না, দেখা যাবে তিনি বেশ গম্ভীর ধরনের মানুষ। কিন্তু লেখক নাজিম উদ্দিন বেশ চমৎকারভাবে আমার সাথে দিনের পর দিন কথা বলে যেতে লাগলেন ঠিক যেন পাড়ার বড় ভাইয়ের মতন। যে কোন বিষয় নিয়েই তার সাথে কথা বলতাম। এখন মনে পড়লে বেশ লজ্জা পাই, বিব্রতও বোধ করি যে, কী সব ছেলেমানুষি কথাবার্তাই না তার সাথে বলেছি একসময় আমি।
যাই হোক, ধান বানতে শিবের গীত আর না গেয়ে সরাসরি লেখায় যাই। একবার কথাপ্রসঙ্গে নাজিম ভাইকে বলেছিলাম আমি তার অনুবাদ ছাড়া বাতিঘরের আর কারো অনুবাদ পড়ি না। তিনি তখন দুঃখের ইমো দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “কেন? অনেকই তো ভালো অনুবাদ করে”। নাম জিজ্ঞাস করায় বলেছিলেন- শরীফুল হাসান, রবিন জামান খান আর তানজীম রহমানের কথা। সেই আমার প্রথম শোনা তানজীম রহমানের নাম, অনূদিত বই পড়া তারও অনেক পরে। গত বছরের শেষের দিকে আমি বাতিঘর প্রকাশনীতে যেয়ে বেশ কিছু বই কেনার সময় তানজীম রহমান অনূদিত হারলান কোবেনের “কট” আর স্টিফেন কিং এর “দ্য শাইনিং” বই দুটো ভয়ে ভয়ে কিনি (কেননা ততদিনে ভুয়া অনুবাদ কিনে কিনে ঠকে ভুম হয়ে গেছি)। কিন্তু এক “কট” বইতেই তানজীম রহমান আমাকে কট করে ফেললেন তাঁর দুর্দান্ত সাবলীল অনুবাদের মাধ্যমে। এক মুহূর্ত দ্বিধা না করে আমি বলে ফেলি তখন, তানজীম রহমান বাতিঘরের অন্যতম সেরা অনুবাদকদের একজন। আর বছর ঘুরতেই যখন সেই প্রিয় অনুবাদকের প্রথম মৌলিক বই প্রকাশ হওয়ার কথা শুনি তখন স্বভাবতই ভালো লাগে; আনন্দিত হই একজন শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে।
সারসংক্ষেপ অথবা রিভিউ-এর অক্ষম চেষ্টাঃ
“পৃথিবীতে যারা যারা এসেছে, তাঁদের সবারই কোন না কোন একটা উদ্দেশ্য আছে, নিয়তির কোন একটা শূন্যস্থান পূরণ করার জন্যেই আমাদের সবার জন্ম। (আর্কন,পৃষ্ঠা-২৩৩)।
কিন্তু এমন একটা নিয়তির অংশ হতে হবে সেটা শুভ্র কোনদিন ভাবতে পারেনি। “নিয়তি তো ঝড়ের মতই একটা প্রাকৃতিক শক্তি” (পৃষ্ঠা-২২৪) আর সেই ঝড়ের মুখে পড়ে কে কোথায় উড়ে এসে পড়ে তা কি কেউ জানে? জ্ঞান ফেরার পড়েই শুভ্র নিজেকে আবিস্কার করে অন্ধ হিসেবে, কেউ একজন তার চোখ তুলে ফেলেছে আর পাশের টেপ রেকর্ডার থেকে একঘেয়ে কান্নার সুরে একই কথা বারবার বলে যাচ্ছে- “তোমার চোখ সরিয়ে নেয়া হয়েছে কারণ প্রাণীটা এতই ভয়ংকর যে তুমি ওটাকে সরাসরি দেখলে ভয়ে পাগল হয়ে যাবে...” (পৃষ্ঠা- ৯)
চোখ সরিয়ে ফেললেও যে অন্ধকারে এসে পড়েছিল শুভ্র তা ছিল আঁধারেরও অধিক, “এ অন্ধকার আদিম, সৃষ্টির শুরু থেকে কোন আলো এই অন্ধকার ভেদ করতে পারেনি” (পৃষ্ঠা-২১৭)। আর এই অন্ধকারকে ভেদ করতে হলে খুঁজে পেতে হবে সেই আলোর ছুরিটাকে শুধু মাত্র যার সাহায্যেই মারা যাবে ওই প্রাণীটাকে। শুর হয়ে গেল খোঁজা। “কিন্তু এই পৃথিবীর একটা অদ্ভুত রসবোধ আছে। যেভাবে এটা হঠাৎ বিনা কারণে মানুষকে অকথ্য যন্ত্রণা দিতে পারে, তেমনি হঠাৎ কারণ ছাড়াই সে যন্ত্রণা সরিয়েও নিতে পারে”। (পৃষ্ঠা-১৪২) আর শুভ্রর এই যন্ত্রণা থেকে খানিকটা মুক্তি দিতেই হয়তো খুঁজে পেল আরও জনা কয়েক মানুষকে, যারা তারই মতন অন্ধ, জানে না কারা এখানে কেনইবা ফেলে গেছে তাঁদের, মুখোমুখি করতে চাইছে কোন ভয়ংকর প্রাণীর সামনে। তাঁদের একজন ধর্মভীরু প্রকৃতির, কেউ হয়তো ঘোর সন্দেহবাদী, অপরজন নেশাখোর তো আরেকজন সিরিয়াসনেসের অভাবে হালকা চটুল কথাবার্তায় মগ্ন। কিন্তু তাঁদের সবার মাঝেই রয়েছে একটা বিষয়ে মিল। তারা প্রত্যেকেই খুনি। এই অন্ধকার গোলকধাঁধায় এই পাঁচজন খুনিকে অন্ধ করে ফেলে দেয়ায় কার কি উদ্দেশ্য থাকতে পারে তা জানা যাবে গল্পের শেষ অংশে।
ধর্ম-দর্শন-বিজ্ঞান-পুরাণ-সাহিত্য-ইতিহাস আর মনোঃবিশ্লেষণের এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন লেখক তানজীম রহমান তার এই প্রথম উপন্যাস “আর্কন”-এ। প্রথম উপন্যাস হিসেবে কোথাও এতটুকু ছাড় দেননি তিনি।
শয়তানের সাথে বাজি ধরার একটি গল্পের দেখা পাই এডগার এলান পোর একটা গল্পে, “Never bet the devil your head”। বাংলা সাহিত্যে আধিভৌতিক রহস্যের দেখা পাওয়া যায় বিভূতিভূষণের “তারানাথ তান্ত্রিকের গল্প” নামে একটি গল্পে, যেখানে তন্ত্রসাধনার দেখা পাই, মহাডামরীর সে ভীষণ রূপ কি লেখক বিভূতি ছাড়া আর কেউ কি বর্ণনা করতে পারে। অনিরুদ্ধ রায়ের লেখা “বিদায়, শরীর” নামের একটি উপন্যাসেও আমরা দেখি একই লোক কিভাবে অন্যের শরীরে ভর করে বেঁচে থাকে যেমনটা দেখা যায় কাজী আনোয়ার হোসেনের রূপান্তরিত এই উপন্যাসিকায়। আমি ঠিক হরর পাঠক নই, যারা আছেন তারা হয়তো এই ধরনের বইয়ের কথা আরও উল্লেখ করতে পারবেন, তবে আর্কন পড়ার পর আমার মনে হল এই ধরনের বইয়ের ব্যাপারে তানজীম রহমান তার পূর্বসূরিদের যোগ্য উত্তরসূরি।
দুর্বলতা-সবলতা
নাম যদিও দিয়েছি দুর্বলতা সবলতা, আমার মনে হয় শুধু সবলতা দিলেই ভালো হত কারণ লেখকের দুর্বলতা এতই কম যে তা সম্ভবত গণনার মধ্যেই ধর্তব্য নয়।
প্রথমে আসি সবলতায়-------
প্রতিটি লেখক নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গিতে ভিন্ন আলোয় আমাদের এই বৈচিত্র্যশীল সমাজকে দেখেন। লেখক তানজীম রহমানও এর ব্যতিক্রম নন। তাঁর রয়েছে এক গভীর দৃষ্টি সমাজ এবং সমাজের বসবাসরত মানুষদের সম্পর্কে। সমাজের অন্ধকার দিক নিয়ে লেখকের যে জ্ঞান তা সত্যিই মুগ্ধ করার মতন। তিনি বেশ সাবলীল আর মার্জিতভাবে চিত্রিত করেছেন সমাজের সেইসব অন্ধকার দিক যা নিয়ে আমরা ততটা চিন্তিত নই। তাঁর লেখা পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে যেন লেখক স্বয়ং সেই সমাজের একজন বাসিন্দা ছিলেন। আমি মনে করি এমনটাই হওয়া উচিত, একজন পাঠক যেন লেখকের যে অভিজ্ঞতা তা যেন পুরোটা গ্রহন করতে পারে তার লেখা পড়ার মাধ্যমে।
চরিত্র বিশ্লেষণ এবং প্রতিটি চরিত্রের ডিটেইলিঙের প্রতি লেখকের যে একনিষ্ঠ মনোযোগ তা অবধারিতভাবে প্রশংসার দাবি রাখে। সাথে সাথে প্রতিটি চরিত্রের মনঃসমীক্ষণও সমানভাবে গুরুত্ব বহন করে।
আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারে লেখক যথেষ্ট শক্তিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন। খেয়াল করি পরপর দুইটি লাইনে একবার শুদ্ধভাষা আবার পরের লাইনেই আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহারে তিনি কখনোই গোঁজামিল দেননি, যা ভুল বশত হতেই পারত বলে আমার ধারণা। তবে আমার কাছে মনে হয়েছে যে সব শব্দ তিনি “স” দিয়ে লিখেছেন সেগুলো “ছ” হিসেবে দিলেই পড়তে সুবিধে হত। কারণ “ছ” হিসেবে দিলে যতটা জোর পড়ে একটা শব্দে “স” হিসেবে দিলে ততটা জোর পড়ে না। যেমন করসোস আর করছোস, এইরকম আর কি।
লেখককে যেভাবে সমাজ আর রাজনীতির বিভিন্ন অসঙ্গতি নিয়ে ব্যঙ্গ করতে দেখি তাতে লেখকের সেসব বিষয়ে গভীর সচেতন দৃষ্টির পরিচয় মেলে।
“এই দেশের সব রাঘব বোয়ালেরই তো কোন না কোন টপ সিক্রেট আছে। ... এখানে তো নিরাপত্তা বলে কিছু নেই, অহরহ সংবাদিক খুন হয়, আর সেসব খুনের কোন সুরাহা হয় না”। (পৃষ্ঠা-১৩৯)
“কিন্তু বাংলাদেশে চাকরি টিকিয়ে রাখার জন্য তুমি কাজ কতটা ভালো পার তার চেয়ে তুমি কাদের সাথে খাতির রাখো সেটা অনেক বেশি জরুরি”। (পৃষ্ঠা-২০১)
“বাংলাদেশের বেশিরভাগ নেতাদের সাথে তার একটা বড় পার্থক্য আছে। উনি সবসময় খুব শুদ্ধভাষায় কথা বলেন, মেজাজ খারাপ হলেও তার মুখ কখনও খারাপ হয় না”। (পৃষ্ঠা-২৪২)
“বেশিরভাগ পুলিশ অফিসারই তো গডফাদারদের পকেটে। পুলিশ যদি টাকা খেয়ে মানুষ গুম করে, তাহলে পুলিশ আর গুণ্ডার মধ্যে পার্থক্য থাকল কি?
দেশের মন্ত্রিরা যদি গডফাদার হয়, তাহলে পুলিশের গুণ্ডা না হয়ে উপায় কি?” (পৃষ্ঠা-২৮০)
“তিনি কাজের দক্ষতা দেখিয়ে পদ পাননি, নানা রাজনৈতিক কারণে পেয়েছেন”। (পৃষ্ঠা-২৯৪)
কয়েকটি অদ্ভুত সুন্দর উপমার ব্যবহার দেখতে পাই আমরা বইটির পাতায় পাতায়---
“মৃত প্রজাপতির শুকনো ডানার মতো বাতাসে আস্তে আস্তে ভেসে এলো শব্দটা”। ( পৃষ্ঠা-৮৭)
“গলাটা কেমন অদ্ভুত। শুনলে মনে হয় ব্যবহার না করতে করতে গলাটায় জং ধরে গেছে”। ( পৃষ্ঠা-১০০)
“ভারি পাথরের চাকার মত আস্তে আস্তে গড়িয়ে শেষ পর্যন্ত সন্ধ্যা নেমে এল। তারপর আকাশ ঝুপ করে রাতের কালো চাদর গায়ে জড়িয়ে নিল”। (পৃষ্ঠা-৪৭)
“কৈশোর বড় বিপজ্জনক একটা সময়, এ বয়সী ছেলেদের নিয়ন্ত্রণ করতে যাওয়া আর মাইন খচিত মাঠ দিয়ে দৌড়ে যাবার মতই ঝুঁকিপূর্ণ”। (পৃষ্ঠা-২৩৭)
“ক্ষমতা আর টাকা যেভাবে মানুষকে টানে মধুও সেভাবে মৌমাছিকে টানে না”। (পৃষ্ঠা-২২১)
জেলখানা সম্পর্কে একটি উক্তি, “এটা যেনো বৃহত্তর সমাজের একটা অন্ধকার প্রতিবিম্ব”। (পৃষ্ঠা-৮০)
আত্মহত্যা সম্পর্কে লিখেছেন, আত্মহত্যা হল মনের “অন্ধকার প্রার্থনা” ।(পৃষ্ঠা-১২৬)
এসির ঠাণ্ডা বাতাস সম্পর্কে লিখেছেন- “প্যাকেট করা ঠাণ্ডা বাতাস”। (পৃষ্ঠা-১৩৬)
কয়েকটি নিত্য প্রচলিত শব্দের ব্যবহার দেখতে পাই উপন্যাসটিতে। যেমন “হাউকাউ”, “মাজা”, “ব্যাজার”। আবার অপ্রচলিত শব্দের ব্যবহারও দেখি- “শুভ্র চোখ মুদলো”।
আগালো, এগোলো দুটোই ঠিক, কিন্তু একই পৃষ্ঠায় (পৃষ্ঠা-৩৯) দুইবার দুই রকম লিখলে নিশ্চিতভাবেই পাঠকের পড়তে খারাপ লাগে। যেকোনো একটা ব্যবহারই কি সেখানে তাই যুক্তিযুক্ত নয়? আবার “এতক্ষণ এতোকিছু” একটাতে “ও-কার” যোগ করলে আরেকটাতে “ও-কার” যোগ করলে কি সমস্যা হত?
লেখক যেন বুঝতে পারছিলেন পাঠক কোথায় কোথায় প্রশ্ন তুলতে পারে তাই পৃষ্ঠা উল্টাতে না উল্টাতেই
সেই সব সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাই। যেমন সুমনার প্রসঙ্গ যেখানে আসে সেখানে আমার পড়তে যেয়ে খটকা লাগে, একজন পুলিশ অফিসার যে বাসায় ভাড়া থাকে সেই একই বাসায় একজন অ-কেজো লোক কিভাবে তার স্ত্রী নিয়ে থাকে। শুধুমাত্র এই প্রশ্নের উত্তর দিতেই বোধ হয় লেখক পরের পাতায় লেখেন, এখন সে একটা ভালো স্কুলে শিক্ষকতা করে। অর্থাৎ কতটা যত্ন আর তীক্ষ্ণ মেধার অধিকারী লেখক হলে এই সব সূক্ষ্ম ব্যাপারেও নজর থাকে তা আমাদের মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু লেখার ভুল তবু থেকেই যায়- লেখকের ভুল তবুও থেকে যায়। যেমন এখানে রয়েছে-
“পিন্টু গিয়ে বিছানায় বসে পড়লো। সগির বসল, দাঁড়িয়ে রইলো”। ( পৃষ্ঠা-৬৯)
“কিছুক্ষণের মধ্যেই পাহাড়ের আকার ধারণ করলো।
দ্রুত সে জায়গাটা একটা ঢিবিতে পরিণত হলো, তারপর পাহাড়”। (পৃষ্ঠা-৫২) কোনটা যে আগে হল বুঝলাম না। পাহাড় না ঢিবি?
“সেদিন সন্ধ্যেবেলায়ই রওনা দিল ওরা দুজন। (পৃষ্ঠা-২৩৮)
... কিন্তু ভর দুপুরে এরকম একটা হত্যাকাণ্ড তো আর উড়িয়ে দেয়া যায় না”। (পৃষ্ঠা-২৪০)। সন্ধ্যেবেলা রওনা দিয়ে দুপুরে খুন করল?
যে দেয়াল ধরলেই শক খাওয়ার মতন হাত সরিয়ে নেয় শুভ্র (পৃষ্ঠা-১০৭) সেই একই দেয়াল ধরে কিভাবে পতন ঠেকায় বশির ভাই (১১৫) বোঝা যায় না।
বাক্য গঠনে বেশ কয়েক জায়গায় দুর্বলতার পরিচয় দিয়েছেন লেখক। নিচে কয়েকটি বাক্য খেয়াল করি-
“ও পাগলের মতো আশেপাশে হাত ছুঁড়তে লাগলো। হঠাৎ ওর বাঁ হাতে শক্ত, চারকোণা, এবড়ো- থেবড়ো কিছু একটা এসে লাগলো। ও খপ করে জিনিসটা নিজের মুঠোয় নিয়ে নিলো। ওই থান ইট। ইটটা ও সর্বশক্তি দিয়ে রিন্টুর মাথার ডানদিকে বসিয়ে দিলো। “ভুট” করে একটা একটা ভোঁতা শব্দ হলো”। (লাগলো-লাগলো-নিলো-দিলো-হলো)
আরেকটা দেখা যাক-
“... অনেকটা তেমন লাগছে। মাথা দপদপ করছে। কানগুলোতেও যেন ঝি ঝি ধরে আছে। যেন কেউ ওর পাশে দাঁড়িয়ে বিড় বিড় করে কথা বলছে”। (লাগছে-করছে-আছে-বলছে)
বারবার একই ক্রিয়াপদ দ্বারা বাক্য শেষ করলে পাঠকের মনে স্বাভাবিক ভাবেই বিরক্তির উৎপাদন হয়। আমার মনে হয় এই একই ক্রিয়াপদ দিয়ে বাক্য শেষ না করে বাক্যের মাঝে ক্রিয়াপদ রেখে বাক্য শেষ করলে হয়তো বাক্য বিন্যাস অনেক সুন্দর আর পরিমার্জিত মনে হত।
শাহাদুজ্জামানের লেখায় “বিহ্বল” আর “নিরালম্ব” এই দুটি শব্দের আধিক্য দেখে আমাদের ধারণা হয় তিনি এই শব্দ দুটির প্রতি দুর্বল আর আর্কন বইতে “ও” এর ব্যবহার দেখে আমাদের মনে হয় লেখক তানজীম রহমান “ও”-এর প্রতি শুধু দুর্বলই নন, যেন প্রেমে পড়েছেন। উদাহরণ দেই-
“ও চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। যখন ও দেখলো দশ মিনিট ধরে আর কেউ বের হচ্ছে না, ও সিগারেটটা ড্রেনে ছুঁড়ে ফেলে মসজিদের দিকে রওনা দিলো। ও আরেকটু হলে স্যান্ডেল পড়েই মসজিদে ঢুকে গিয়েছিলো। সৌভাগ্যবশত ওর শেষ মুহূর্তে কথাটা খেয়াল হলো। ও স্যান্ডেল দুটো হাতে নিয়ে পা দিলো মসজিদের ভেতর”। (পৃষ্ঠা-১৩৬)
এক প্যারাগ্রাফে এতগুলো “ও” যথেষ্টই বিরক্তিকর।
উপন্যাসের কয়েকটা অংশ পড়ে মনে হল লেখক আমাদের ধরে ধরে বিজ্ঞানের ব্যাপার- স্যাপারগুলো বোঝাতে চাচ্ছেন----
“বিস্ফোরণের কারণে বাতাস বেয়ে শক্তির একটা ঢেউ বয়ে যায়, সেটাকে বলে শকওয়েভ”। (পৃষ্ঠা-৩১৮)
“বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক পদার্থ আছে যেগুলো খেলে, শুঁকলে, এমনকি চামড়ায় লাগলেও মানুষের নানা রকম বিভ্রম হয়। অনেকটা জেগে স্বপ্ন দেখার মত, কিন্তু স্বপ্নের চেয়ে অনেক বেশি বাস্তব মনে হয় অভিজ্ঞতাটা। এই বিভ্রমগুলোকে বলে হ্যালুসিলেশন। (পৃষ্ঠা-৩২৭)
অতি সরলীকরণ লেখা যেমন একটি ভালো বইকে নষ্ট করার পেছনে দায়ী থাকে ঠিক তেমনি কোন একটা অংশকে অযথা দীর্ঘায়িত করলেও লেখায় পাঠকের মনোযোগ ছেদ পড়ার আশংকা থাকে, যেমনটি আমরা দেখি ২৭৮- ২৯২ পৃষ্ঠায়। উপন্যাসের এই অংশে এসে এত ফাস্ট পেসড লেখাকেও ভীষণ শ্লথ মনে হল। পড়তে গিয়ে মনে হচ্ছিলে এই অংশটি এইভাবে লেখা হল কেন? আমার কাছে প্রলম্বিত মনে হয়েছে। শুধুমাত্র একটা ক্যারেক্টার ডেভেলপ করার জন্যে এত এত কথামালা না সাজালেও হয়তো চলত। যেখানে আমরা গুরুত্বপূর্ণ সব চরিত্রের চিত্রায়নে অপেক্ষাকৃত কম বর্ণায়ন দেখেছি। যেমন প্রথম অংশের প্রোটাগোনিস্ট শুভ্র’র কথাই ধরা যাক। আমাদের জানামতে শুভ্র ক্যাডেট কলেজে পড়াশোনা করত, কিন্তু কিভাবে সে মিলিটারি স্কুল ছেড়ে চলে আসল, তা জানা যায় না। আবার শুভ্র’র সাথে যে তার বাবার বেশ ভালো একটা সম্পর্ক আছে তা ধারণা করা যায় বিভিন্ন উক্তির মাধ্যমে কিন্তু এমন একটা ভালো বাবার ছেলে কিভাবে খারাপ হল তা নিয়েও আলোচনা করা যেতে পারত। সেসবের কিছুই করা হয়নি।
কারা শুভ্রদেরকে আটকে রেখেছিল আর কারাই বা দায়ী ছিল তাঁদের এমন অন্ধ করার পিছনে এই ব্যাপারটা নিয়ে পাঠককে আরও একটু খেলাতে পারতেন লেখক তানজীম রহমান কয়েকটা চ্যাপ্টার আগু-পিছু করলেই। কিন্তু এই ব্যাপারটা হয়তো মিস করেছেন লেখক। সচেতন পাঠক মাত্রই বুঝতে পারবেন আমি কোন অধ্যায়ের কথা বলছি এখানে। মূলত আমরা পাঠকেরা তো খেলতেই চাই লেখকের সাথে। পৃথিবীতে মনে হয় এই একটি খেলাই আছে, লেখক পাঠকের খেলা, যে খেলায় হেরে গিয়েও জয়ী হওয়ার আনন্দ পায় একজন পাঠক।
শেষ করি “বাতিঘর” প্রকাশনীর কিছু দুর্বলতা দিয়ে। আমরা এর আগেও দেখেছি “বাতিঘর” কিভাবে একটা ভালো কাহিনীকে দুর্বল এবং বিরক্তিকর বানিয়ে দেয় বারবার বানান ভুলের মাধ্যমে। এই বইও এর করাল গ্রাস থেকে মুক্ত নয়। বানান ভুল তো আছেই সাথে আছে চরিত্রের নাম ভুল করে বসিয়ে দেয়া। যেমন ৯৯ পৃষ্ঠায় শুভ্র হয়ে গেছে পিন্টু, আবার কয়েক পৃষ্ঠা সামনে এগোতেই সিড হয়ে গেছে শুভ্র, শুভ্র হয়ে গেছে সিড। এইরকম ভুল চলতেই থাকে। আশা করছি পরের সংস্করণে এই ভুলগুলো শুধরানো হবে।
কয়েকটা শব্দের বানান সম্ভবত কম্পোজার জানেন না তা না হলে একই বানান কিভাবে এতবার ভুল করে- অশরীরী, শারীরিক, কোমর, করাল।
এত কিছুর পরেও বাতিঘরকে ধন্যবাদ না দিয়ে উপায় নেই কারণ সেই তো বইটি প্রকাশ করে আমাদের পড়ার সুযোগ করে দিয়েছে। দুর্দান্ত প্রচ্ছদের জন্যে বব ডিলান ভাইকে ধন্যবাদ দিতেই হয়, সাথে ধন্যবাদ জানাতে চাই নাজিম উদ্দিন ভাইকে এই বইটি প্রকাশ করার সাহস দেখিয়েছেন বলে।
শেষ কথা-------
ইফতেখার ভাই একবার আমাকে বলেছিলেন- তোমার কি নেই সেটা সবাই বের করতে পারবে, যেমন তোমার গাড়ি নেই, ভালো বাড়ি নেই, তুমি আরবিতে কথা বলতে পার না এইসব যে কেউ বলতে পারবে, এনিবডি কিন্তু তোমার কি আছে সেটা সবাই বলতে পারবে না। যে সব কিছুতেই কিছু না পাওয়া দেখতে পায় সে সমালোচক, সমালোচক হওয়া খুবই সোজা। শুধু বইতে কি নেই তাই বের করে দেয়া যা সবাই পারে, কিন্তু একটা বইতে কি আছে সেটা বের করা খুব সোজা নয়। যে এটা বের করতে পারে সে লেখক। কারণ লেখকেরাই সব কিছুর মধ্যে থেকেও ভালো কিছু বের করে আনতে পারেন।
আফসোস আমি সে শক্তি পাই নি, তাই হয়তো সারাজীবন সমালোচকই থেকে যাব।
তানজীম রহমানকে অসংখ্য ধন্যবাদ বাংলা ভাষায় একটি শক্তিশালী আধিভৌতিক রহস্য উপন্যাস লেখার জন্য। আমি আশা করছি লেখক তার লেখা নিয়ে বাংলা সাহিত্যকে আরও অনেকদূর নিয়ে যাবেন, একটা শক্ত অবস্থানে।
দুর্বলতায়-সবলতায় তানজীম রহমানের “আর্কন”- একটি অতিদীর্ঘ আলোচনা
Mehedie Hassan https://bookshelvez.com//Attachments/BookCovers/1034.jpgকথায় আছে, লোহা গরম থাকতেই হাতুড়ি মারতে হয়। আমিও সেই একই নিয়ম অনুসরণ করে তাওয়া গরম থাকা অবস্থাতেই পরোটা ভেজে ফেললাম অর্থাৎ বই পড়ে শেষ করার সাথে সাথেই বই নিয়ে আলোচনায় চলে গেলাম মানে লিখতে বসলাম আর কি।
দুর্বলতায়-সবলতায় তানজীম রহমানের “আর্কন”- একটি অতিদীর্ঘ আলোচনা
https://bookshelvez.com//Attachments/BookCovers/1034.jpg