হুমায়ূন_আহমেদের_“জীবনকৃষ্ণ_মেমোরিয়াল_হাই_স্কুল”_এবং_আমার_কিছু_স্মৃতি

প্রথম ক্লাস শেষ করে আমরা যখন বসে বসে একে অপরের সাথে গুলতানিতে ব্যস্ত ঠিক সেই সময় হেড স্যারের আগমন আমাদের চমকিত করে। স্যারের পিছু পিছু হেঁটে আসা কালো গোঁফওয়ালা ভদ্রলোককে কেন জানি কোন কারণ ছাড়াই প্রথম দেখাতেই আমাদের অপছন্দ হয়ে যায়। স্যার পরিচয় করিয়ে দেন- “ইনি তোমাদের নতুন শিক্ষক, জনাব সানাউল হক (সানা উচ্চারণে ছানা)। তোমাদের এলাকারই ছেলে। আশা করছি তোমরা চিনবে। তো স্যারের ক্লাস করো আর স্যারের সাথে ভালো ব্যবহার করবে কারণ স্যার কিন্তু খুব রাগী মানুষ, হু হু”। রাগী মানুষ প্রমাণ করার জন্যেই কিনা কে জানে স্যার চোখ মুখ পাকিয়ে জলদগম্ভীর স্বরে ফোঁস করে নিশ্বাস ছেড়ে বললেন- “হুম”। হেড স্যার চলে যেতেই টেবিলের উপর বসে স্যার সমাজ বই চেয়ে নেন- “দ্যাখা, তোদের কি পড়াচ্ছে এখন”।

তখন সবেমাত্র নবম শ্রেণিতে উঠেছি। নাকের নিচে কচি লোম গজানোর মতই বুকের ভিতর আত্মসম্মান, লজ্জা এবং বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণের মতন দুর্বোধ্য-অব্যাখ্যায়েও-অজানা-দিশাহারা সব বোধগুলো মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। বেত খেতে যদিও রাজি আছি তখন কিন্তু একে অপরের কান ধরতে কেন জানি মরমে মরে যাই। তাই স্যার যখন এসেই “তুই-তোকারি” করতে লাগলেন সেটা শুনেই সবার ভুরূ কুচকে গেল। এ আবার কেমন ধারার স্যার? নাম ধাম জিজ্ঞাস করা নাই, নিজের পরিচয় দেয়া নাই, এসেই পড়া ধরা? ধুর, স্যার ভালো না। স্যারকে পড়া দেখিয়ে দিতেই, পিছন বেঞ্চের আলমগীরকে অঙ্গুলি ইশারায় দাঁড় করিয়ে বললেন- “এই তুই বল, সমাজ কাকে বলে?” যথারীতি আলমগীর তার বোকা বোকা হাসি হেসে সবগুলো হলুদ দাঁত দেখিয়ে বলল- “স্যার পারব না”। স্যার তখন “ছাত্র মারা” হুংকার দিয়ে বললেন- “কি, পারিস না? পড়িস কি তাহলে? এই তুই কান ধর”। চোখ কটমটিয়ে বাকি সবার দিকে তাকিয়ে দাঁত কিড়মিড়িয়ে বললেন- “তোদের ভাগ্য ভালো যে আজকে প্রথম দিন, আমি বেত নিয়ে আসিনি, না হলে চাবকে তোদের পিঠের ছাল...। না, তোলা হল না আমাদের পিঠের ছাল, তার আগেই দরজার পাশে এক ছায়ামূর্তি দেখে থমকে যেতে হল স্যারকে- “এই তুই কে?”

প্রতিটি ক্লাসেই একজন করে লেট লতিফ থাকে। শ্রেণীভেদে এই সব লতিফদের নাম পরিবর্তিত হলেও আচরণবিধির কোন পরিবর্তন হয় না। যেমন আমাদের ক্লাসে ছিল “লেট রাসেল”। আমি আমার স্কুল জীবনের কোনোদিন তাকে প্রথম ক্লাসে উপস্থিত হতে দেখিনি। প্রতিদিন ক্লাসে এসেই সে দৌড় দিত টিচার্স রুমে, নাম প্রেজেন্টের জন্য। রাসেল, যে ছিল একাধারে প্রকৃতিবিদ (ডারউইনের মত প্রজাপতি ধরার নেশা না থাকলেও তার ছিল ব্যাঙ ধরার নেশা, ব্যাঙ দিয়ে সে একিউরিয়াম বানাত), রকেট সায়েন্টিস্ট (পটকা দিয়ে একবার নারকেল গাছের মাথায় আগুন ধরিয়ে আমাদের দেখিয়েছিল কিভাবে বাড়িতে আগুন লাগলে এই সাইন দেখিয়ে পাড়ার সবাইকে সতর্ক করে দেয়া যায়), বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ (সে আমাদের ফ্রি ফ্রি ইসলামের জ্ঞানের কথা জানাত, যার সবই বিয়ের পরে কাজে লাগবে বলে আমরা তা সাগ্রহে গিলতাম) এবং আমাদের ক্লাসের একমাত্র স্বভাব কবি। অর্থাৎ কিনা রবীন্দ্র-পরবর্তী যুগে একমাত্র সব্যসাচী প্রতিভা। তবে আমরা সবাই এই ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলাম যে, রবীন্দ্রনাথের চেয়ে অন্তত এক বিষয়ে রাসেল সব সময়ই এগিয়ে থাকবে, বিবাহ পরবর্তী ইসলাম বিষয়ক জ্ঞান আর যাই হোক রবীন্দ্রনাথের ছিল না।

সেই রাসেলকে আপাদমস্তক দেখে স্যার আবার বিস্ময়ে বলেন- “তুই কে? বলা নাই কওয়া নাই হনহন করে ক্লাসে ঢুকে পড়িস?” রাসেল ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে এদিক সেদিক তাকায়, সাহায্যের আশায়। সামনের বেঞ্চের ছাত্র ফিসফিসিয়ে সবাইকে শুনিয়ে বলে- “নতুন স্যার, নতুন স্যার”। স্যার তখন বলেন- “আমার চেহারা ছাত্রের মতন নাকি যে বলে দিতে হবে আমি স্যার?” নিজের রসিকতায় নিজেই মুগ্ধ হয়ে আমাদের স্কুলঘরের মরচে পড়া টিন কাঁপিয়ে ঠা ঠা করে হেসে ওঠেন স্যার, আমরা ভয় পাই। রাসেল স্যারকে সঙ্গ দেয়ার লোভে হেসে ওঠে। কিন্তু তাতে হিতে বিপরীত হয়, স্যার হাসি থামিয়ে বাজখাই গলায় বলেন- “গাধার মতন দাঁত কেলিয়ে হাসছিস কেন? মজা খাওয়া হচ্ছে না? বেরো ক্লাস থেকে”। রাসেল তো অবাক, বলে কি? চোখ গোল গোল করে সে বলে- “স্যার বেরিয়ে গেলে ক্লাস করব কেমন করে?”

“ক্লাস করার কোনো দরকার আছে বলে আমি মনে করি না”। স্যারের পষ্টাপষ্টি উত্তর।

 

রাসেল যে নাছোড়বান্দা এ তো সকলেরই জানা কিন্তু স্যার যে গোঁয়ার গোবিন্দ তা আমাদের জানা ছিল না, তাই যখন দেখলাম রাসেলকে ঢুকতেই দিচ্ছে না তখন আমরাও ওর সাথে জুরাজুরি করতে লাগলাম। স্যার তখন গার্লস স্কুলের পুকুর দেখিয়ে বললেন- “এক মিনিটের মধ্যে যদি ঐ পুকুর থেকে এক খাবলা কাদা তুলে নিয়ে আসতে পারিস তবেই তোকে ক্লাসে ঢুকতে দেব”। কিন্তু এ যে অসাধ্য কাজ। ঐ দুরত্ব তো আমরা এবং আমাদের আগে যেসব বড় ভাইয়েরা পড়ে গেছে তারাও ঘোচাতে পারে নি ঢিল ছুঁড়ে ছুঁড়ে। অনেকক্ষণ চেষ্টা করার পরও স্যারকে যখন তাঁর সিদ্ধান্ত থেকে টলানো গেল না তখন রাসেলকে আমরা তাঁর পাতলুন হাঁটুর উপর তুলতে দেখি। সে প্রস্তুত, সাথে স্যারের ঘড়িও। রেডি ওয়ান টু থ্রি। এ যে অলিম্পিকের সেরা দৌড়বিদকেও হার মানিয়ে যাচ্ছে রাসেল, তার দুর্দান্ত গতিময়তায়। রাসেল কি তবে পারবে? ঐ তো রাসেলকে দেখা যাচ্ছে পুকুরের ঘাটে নেমে কাদা তুলতে, এখনই ঘুরে চলে আয় রাসেল আর বেশি সময় নেই। এ কি??

সেদিনই প্রথম আমরা জানলাম মহাকর্ষ অভিকর্ষ ছাড়াও আরেক ধরনের কর্ষ আছে তা হল জলাকর্ষ যা জলের কাছে গেলেই টের পাওয়া যায়। আর নিয়তির (অর্থাৎ জলের) সেই অমোঘ টানে রাসেল পানিতে গমন করে তখন পঞ্চদশবর্ষী কিশোরীদের হাসির শব্দ যা শুনলাম (মানে অনুভূত হলাম) আমরা তাতে মনে হল রাসেলকে আরেকবার পানিতে চুবিয়ে আসি সদলবলে। যাই হোক সেই জলসিক্ত পুরুষোত্তম যখন ক্লাসে এল তখন তার সারা গায়েই কাদা। চেয়েছিল এক খাবলা ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে নিয়ে এলে পুরো গা ভর্তি করে? স্যার বললেন- বাড়ি যা, ক্লাস করার দরকার নাই।"

এ হেন কঠোরতর অপমান সহ্য হল না রাসেলের। পরের দিনই কবিতা নিয়ে হাজির হল সে ক্লাসে। দীর্ঘ সে কবিতার নাম ছিল ছানা। যার প্রায় অনেকটাই মুখস্থ ছিল আমাদের বহু বছর, আলোড়িত করেছিল আমাদের চিত্ত।

 

ছানা                                       

লিখেছেন কবি রাসেল মাহমুদ

ছানা ছানা ছানা

ছানা হয় দানা দানা

ছানা খেতে নাই মোদের মানা।

ছানার অনেক ব্যবহার আছে অজানা।

আজ হবে সব জানা

ছানা

ছানা শুধু খাবারেরই নাম নয়

ছানা অনেক মানুষেরও নাম হয়।

ছানা

ছানা বানায় আমাদের পাড়ার মকসেদ কানা।

 

এই পর্যায়ে আসতেই আমাদের ক্লাসের রাগী বন্ধু কামাল উঠে দাঁড়ায়, “এইটা কী হইল দোস্ত?” আমাদেরও বুঝতে বাকি থাকে না কি হয়েছে। কেননা মকসেদ কামালের বাবার নাম, আর তার বাম চোখে সমস্যার কথা কে না জানে, তবে আমরা মৌন থাকি। রাসেল তখন বন্ধু কামালের পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে বলে- “দোস্ত চ্যাতো ক্যান? এইটা তো দোস্ত কবিতার মিলের জন্যে ব্যবহার করছি”। কামাল তখন দ্বিগুণ রেগে বলে- “ক্যান তোর বাপের নাম ব্যবহার করলে সমস্যা কি হইত?” রাসেল তখন অমায়িক হাসি হেসে বলে- “দোস্ত আমার বাপের নাম হল আবদুল মান্নান এই নামের সাথে কিভাবে মিলায়ে কবিতা লিখি?” কামালের গাইগুই অগ্রাহ্য করেই রাসেল কবিতা চালিয়ে যেতে লাগলো-

 

ছানা এখন আর নেইকো ছানা

ছানা এখন স্কুলে পড়ায় এ তো সবারই জানা

ছানার গজেছে ডানা

ছানারে মেরে তক্তা বানা

প্যাকেট করে পাঠিয়ে দে ঘানা।

 

ব্যাপক আলোচিত এবং সেই সময়ে বিখ্যাত এই কবিতা কিভাবে ছানা স্যারের হাতে পড়েছিল সেই গল্প না হয় আরেকদিন করা যাবে।

 

“কথা পরম্পরা”য় শাহাদুজ্জামানকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বলেছিলেন- “মধ্যবিত্ত মানুষেরা বেসিক্যালি নার্সিসিস্ট। তারা নিজেকে নিয়ে, নিজের অতীতকে নিয়ে থাকতে ভালবাসে। লক্ষ করেছ নিশ্চয়, ওসমান (চিলেকোঠার সেপাই-এর ওসমান) পড়ার মধ্যে শুধু “পথের পাঁচালী” পড়ে। যে লোকটা দিনরাত পথের পাঁচালী পড়ে সে কিন্তু এ বিট নার্সিসিস্ট। কারণ পথের পাঁচালী পড়ে যতটুকু আরাম পাওয়া যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বা তারাশঙ্কর পড়ে ততটুকু আরাম পাওয়া যায় না। আর মধ্যবিত্তের প্রবণতা হচ্ছে আরামের মধ্যে থাকা”। আমরা যদি শাহাদুজ্জামানের গল্প বা উপন্যাসের দিকে তাকাই তাহলেও কিন্তু এই ব্যাপারটা লক্ষ করব, সেখানে দেখব শাহাদুজ্জামান কীভাবে তাঁর গল্পে ঠিক ঠিক লোক সংস্কৃতির কথা বলে যাচ্ছেন, একটা ভীষণ আকুতি দেখতে পাই সেই ফেলে আসা দিনগুলির প্রতি, সেই লোকজ ঐতিহ্যের প্রতি। মধ্যবিত্ত মানুষ বলতেই হয়তো এইসবই বোঝায়, ফেলে আসা দিনগুলির প্রতি একধরনের অবোধ টান আকর্ষণ করে। আমিও তো মধ্যবিত্তের একজন স্বাপ্নিক মানুষ, আমিও এমনটাই। আমি যেমন কিছু লিখতে বসলেই ইনিয়ে বিনিয়ে ঘুরিয়ে পেচিয়ে স্কুলের কথা টেনে আনি;  স্কুলের কথা বলতে ভালো লাগে, স্কুল জীবনকে মহিমান্বিত করে তুলতে ভালো লাগে, জানি হয়তো সে জীবন ততটা মধুময় ছিল না তবু বর্তমানে বসে অতীতের স্মৃতি রোমন্থনে বেলা বেশ কেটে যায়।

আমি ভালো ছাত্র নই, ছিলাম না কখনোই, তবু কোন এক অদ্ভুত কারণে আমার আশেপাশের মানুষজনেরা মনে করে আমি বেশ ভালো ছাত্র। শুনেছি শিক্ষকেরা মানুষ চিনতে ভুল করে না, ছাত্র দেখে দেখে তারা ঝুনা নারকেল টাইপ হয়ে যায় বিধায় তারা মানুষ দেখলেই বুঝতে পারে কে কেমন মানে ছাত্র হিসেবে কে কেমন। কিন্তু এইসব শিক্ষকদেরও আমি ঘোল খাইয়েছি। তাই অংক পরীক্ষার আগের রাত্রে কাশেম স্যার যখন রাত নয়টার সময় তার ধারণা করা কোন অংকের সাজেশান দেয়ার জন্যে বাড়ির উঠোনে এসে হাজির হন তখন বাড়ির লোকজনের সাথে আমিও অবাক হই। যদিও কাশেম স্যারের দেয়া সেই সম্পাদ্য পরীক্ষায় আসে না তবু সেই স্মৃতি বয়ে বেড়াই আমি নিউরনের অনুরণনে। স্যারের এই ভালোবাসার কথা মনে পড়ে যায় আমার হুমায়ূন আহমেদের “জীবনকৃষ্ণ মেমোরিয়াল হাই স্কুল” উপন্যাসের শিক্ষক ফজলুল হকের সেরা ছাত্রটিকে কোলে করে স্কুলের চারপাশে ঘোরার কথাটি পড়ে। আমি আমার রেজাল্টের দিন স্কুলে উপস্থিত ছিলাম না, থাকলে হয়তো স্যার ও আমাকে এইভাবেই পরম মমতায় জড়িয়ে ধরতেন। শিক্ষকরা হয়তো এমনই, ভালোবাসায় বাঁচায় ছাত্রদের।

হুমায়ূন আহমেদ একজীবনে এত বেশি সংখ্যক উপন্যাস লিখে গেছেন যে উপন্যাসের প্রয়োজনেই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লিখতে হয়েছে তাকে। বিষয়ের যে বৈচিত্র্য আমরা হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস গুলিতে দেখতে পাই তা অন্যান্য ঔপন্যাসিকের মাঝে দেখতে পাই না। মধ্যবিত্তের সংসার জীবন থেকে শুরু করে মোঘল সম্রাট হুমায়ূনের জীবন-ও তার উপন্যাসের বিষয় হিসেবে উঠে আসতে দেখি। যাত্রা পালার জীবন, চলচ্চিত্রের নায়ক নায়িকার জীবন, সার্কাসের জীবন, নিশিকন্যাদের জীবন থেকে শুরু করে কত কত বিষয় নিয়েই না লেখা সে সব উপন্যাস। সম্প্রতি পড়া “জীবনকৃষ্ণ মেমোরিয়াল হাই স্কুল” উপন্যাসটি এমনই এক বিষয় বৈচিত্র্যে অনন্য। স্কুল নিয়ে লেখা এই উপন্যাসটি আমাকে এক বিশেষ কারণে আকর্ষণ করে।

স্কুল নিয়ে লেখা উপন্যাস বলতে আমরা যা বুঝি “জীবনকৃষ্ণ মেমোরিয়াল হাই স্কুল” ঠিক সেইরকম না। স্কুল নিয়ে লেখা অনেকগুলো উপন্যাসের নাম এই মুহূর্তে মনে পড়ছে আমার। এর মধ্যে রয়েছে আর্কাদি গাইদারের “ইশকুল”-এর কথা, তেশা নদীর তীরে আরমাজাস শহরের সেই ইশকুল, যেখানে ফরাসির ক্রিয়াপদ শেখাত “বুড়ি ডাইনি” আর ছিল ধর্মযাজক ফাদার গেন্নাদি যার ক্লাসে সব কিছু করা যায় শুধু পড়াশোনা ছাড়া। মনে পড়ছে কাজী আনোয়ার হোসেন রুপান্তরিত “ইশকুল বাড়ি”র সেই মায়াময় আদর্শ বিদ্যালয় আর তৎসংলগ্ন আবাসিক ইসকুল বাড়ির কথা যেখানে আছেন রহমান খালু আর জুলি খালার মতন মমতাময়ী খালা। আর “ক্লাস এইট”-এর কথাও এই বেলায় বলে নিতে চাই, অদ্ভুত সুন্দর সেই উপন্যাস। মফস্বল শহরের এক মডেল স্কুল এবং সেই স্কুলের হোস্টেলে থাকা কতিপয় ছাত্রকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এই উপন্যাসের কাহিনী। অনেকটা শাহাদুজ্জামানের "খাকি চত্বরের খোঁয়ারি"র মতন হলেও এই উপন্যাস কিশোরদের জন্যে লেখা। ডাক্তার চুরুট আর স্নেহপ্রবণ হারুন স্যারের প্রগাঢ় ভালোবাসা আমাদের চোখকে আর্দ্র করে দেয়। মনে হয় এমন শিক্ষক পেলে আর কি চাই এক জীবনে?

মুহম্মদ জাফর ইকবালের লেখা “নিতু আর তার বন্ধুরা”র বইতে সেই দুর্ধর্ষ “বুতুরুন্নেসা বালিকা বিদ্যালয়”-এর কিংবা “স্কুলের নাম পথচারী”র “পথচারী মডার্ন স্কুল”-এর কথা কি ভোলা যায়? আর সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে হোগওয়ার্টস স্কুল অফ উইচক্র্যাফট এন্ড উইজার্ডী-র সেই জাদুর স্কুলের কথা। পৃথিবীর আর কোন স্কুলে না পড়লেও আমার ওই স্কুলে পড়ার খুব ইচ্ছে হয়েছিল আমার হ্যারি পটার পড়ার সময়। এইরকম নানা ধরনের স্কুলের দেখা পাই আমরা গল্প উপন্যাসে।

ক্লাস এইটে থাকতে আমাদের এক বন্ধু হঠাৎ করে স্কুলে আসা বন্ধ করে দিল, কি কারণ? ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হবে তাই এক্সট্রা পড়াশোনা করা দরকার এই জন্য জেলা সদরে যেতে হয়েছে তাকে। এক বছর পর যখন সে অকৃতকার্য হয়ে আমাদের স্কুলে ফিরে এল ততদিনে সে বন্ধু থেকে জুনিয়র ছোট ভাই হয়ে গিয়েছে। সেই ক্যাডেট কলেজ নিয়ে লেখা অসাধারণ এক উপন্যাসের নাম “খাকি চত্বরের খোঁয়ারি”। শাহাদুজ্জামান তার নিজের সময় কাটিয়ে আসা সেই অদ্ভুত দিনগুলির কথা বয়ান করে গিয়েছেন এক মায়াময় লেখনীতে, পড়তে পড়তে সময় গড়িয়ে যায়।

এই স্কুলগুলোতে মূলত আমরা কি দেখতে পাই? ছাত্র জীবনের কথা। কিন্তু শুধুমাত্র ছাত্রদের নিয়েই তো একটা স্কুল নয় কত কত লোকের সমাগমই না হয় সেখানে। আমাদের ক্লাসে একটা ছেলে পড়ত, নাম ভুলে গেছি, নাম ভুলে যাওয়াই সঙ্গত, কারণ কখনো তাকে নাম ধরে ডাকি নি আমরা, সবসময়ই ডাকতাম “দাদার ছেলে” বলে। আমাদের স্কুলের ঘন্টা যিনি বাজাতেন তাকে আমরা ডাকতাম “দাদা”, সেই দাদারই ছেলে ছিল আমাদের এই সহপাঠী। এই যে ঘন্টাবাদক তিনিও কিন্তু স্কুলের একজন, কিন্তু তাকে নিয়ে কোন উপন্যাস রচিত হয় না এবং কোন উপন্যাসেও তাঁর উপস্থিতি দেখা যায় না কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ তাঁর শক্তিশালী পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে লিখেছেন- “স্কুলের প্রাণ হল তার ঘণ্টা। স্কুলের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পত্তি হল ঘণ্টা”। দেখা গেল এই ঘণ্টার হাতুড়ি চুরি হয়েছে বলে উপন্যাসের প্রোটাগোনিস্ট হেডমাস্টার ফজলুল করিম সেই ঘন্টাবাদককে ফাইন করছেন অর্থাৎ তাকেও মূল্যায়ন করছেন লেখক এইখানে।

স্কুলের শরীর যদি হয় ছাত্র তাহলে সেই শরীরের আত্মা হবে সেই স্কুলের শিক্ষকগণ। স্কুলের শরীর কেমন হবে তা নির্ভর করে এই সব আত্মার দ্বারা। এক্ষেত্রে মনে পড়ছে প্রেমেন্দ্র মিত্রের লেখা অসাধারণ ছোটগল্প “ভবিষ্যতের ভার”-এর কথা। সেখানে আমরা দেখতে পাই শহর থেকে গ্রামের স্কুলে চাকরি করতে আসা একজন শিক্ষক সবিস্ময়ে আবিস্কার করেন যে স্কুলের শিক্ষকেরা ক্লাস নেয়ার পরিবর্তে ঘুমিয়ে কাটাচ্ছেন সারাটি ক্লাস। তিনি এই নিয়ে কথা বলতে গেলে তাকে কয়েকটা দিন অপেক্ষা করতে বলেন অন্যান্য শিক্ষকেরা এবং এই অপেক্ষা করতে করতে এক সময় আমরা দেখি সেই শিক্ষকটিও একদিন ক্লাসে ঘুমিয়ে পড়েছে। এই যে শিক্ষকদের অবনতি তা কিন্তু একটি স্কুলের জন্যে কখনোই মঙ্গল বয়ে আনে না, তাই ফজলুল করিমের ভাষায় শুনি- “ডিসি সাহেবের সঙ্গে চায়ের চেয়ে ছাত্রদের ক্লাস অনেক জরুরী। আপনি শিক্ষক মানুষ। এই ব্যাপারটি আপনি ছাড়া কে বুঝবে?” আবার শিক্ষকদের ভাষা নিয়েও লিখেছেন- “আমরা শিক্ষক মানুষ। কথাবার্তায় আমাদের খুব সাবধান হওয়া দরকার। খুবই সাবধান। শিক্ষদের প্রতিটি শব্দ চিন্তা-ভাবনা করে বলতে হবে”। কিংবা “ছাত্ররা সব সহ্য করতে পারে, শিক্ষকদের বানান ভুল সহ্য করতে পারে না”।

আমি বলছি না “জীবনকৃষ্ণ মেমোরিয়াল হাই স্কুল” খুব আহামরি একটা উপন্যাস। হুমায়ুনী ভুল ভ্রান্তি এখানেও চোখে পড়ার মতন, সিরাজ সাহেব পৃষ্ঠা উলটানোর সাথে সাথেই হয়ে যান রমিজ সাহেব কিংবা মামুন হয়ে যায় মমিন। খেতে বসে গল্প করা লোক বলে ওঠে মাঝে মাঝে উপোস দেয়া ভালো, তবে উপন্যাসটার মাঝে মায়া মেশানো আছে, মমতা দিয়ে গড়া এই উপন্যাসের ফজলুল করিমের চরিত্র, যার একমাত্র দোষ হল সে স্কুল ছাড়া অন্য কিছুই ভাবতে পারেন না। উপন্যাসটি পড়তে শুধু যে ভালোই লেগে যায় তা না, পড়তে পড়তে চোখও ভিজে ওঠে নিজেরই অজান্তে। উপন্যাসটিতে হুমায়ূন আহমেদ তার স্বভাব সিদ্ধ তরলতার আশ্রয় নেননি উপরন্তু পাই এরকম একটি সংলাপ- “বর্তমান মন্ত্রী সিরাজ সাহেবের বাবা মফিজ সাহেব ছিলেন শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান এবং স্থানীয় রাজাকার বাহিনীর প্রধান”, এক্ষেত্রে একটি কথা বলে নেয়া ভালো যে এই উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়েছিল ‘৯৫ সালে, সেই সময়ের উপন্যাসে এরকম একটি সংলাপ বলা সত্যিকার অর্থেই সাহসের পরিচায়ক।

হুমায়ূন আহমেদ শিক্ষক ছিলেন, হুমায়ূন আহমেদের বাবাও শিক্ষক ছিলেন। তাই বলা যায় শিক্ষকতা তাঁর রক্তের সাথেই মিশে ছিল। তিনিই তো ভালো জানবেন শিক্ষকদের সম্পর্কে, জানবেন তাদের দুঃখ-কষ্ট-আনন্দ-বেদনা-লোভ-হিংসা-দ্বেষের কথা, তিনিই তো ভালো বুঝবেন সবার চাইতে। আমার রসায়ন পড়তে একদমই ভালো লাগত না, বেনজিন আর ডেটলের আণবিক গঠনে আমি বারবার তালগোল পাকিয়ে ফেলতাম। তখন আমার হুমায়ূন আহমেদের কথা মনে পড়ত। ভাবতাম যে মানুষটা এত সহজভাবে এত সুন্দর সুন্দর উপন্যাস লিখে গেছেন তিনি হয়তো খুব সুন্দর করে রসায়নের ক্লাস বোঝাতেন। আমি কোনোদিন তাঁর কোন ক্লাস করিনি, এবং জানতামও কোনোদিন তাঁর ক্লাস করতে পারব না কিন্তু আমার খুব তাঁর ক্লাস করতে ইচ্ছে হত। মনে হত তাকে শিক্ষক হিসেবে পেলে আমি হয়তো কোয়ান্টাম রসায়নকেই আমার প্রিয় সাবজেক্ট বানিয়ে ফেলতাম, বাংলা বাদ দিয়ে।

 

সবাইকে ধন্যবাদ।

হুমায়ূন আহমেদের “জীবনকৃষ্ণ মেমোরিয়াল হাই স্কুল” এবং আমার কিছু স্মৃতি

https://bookshelvez.com//Attachments/BookCovers/133.jpg
https://bookshelvez.com//Attachments/BookCovers/133.jpg

হুমায়ূন আহমেদ একজীবনে এত বেশি সংখ্যক উপন্যাস লিখে গেছেন যে উপন্যাসের প্রয়োজনেই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লিখতে হয়েছে তাকে। বিষয়ের যে বৈচিত্র্য আমরা হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস গুলিতে দেখতে পাই তা অন্যান্য ঔপন্যাসিকের মাঝে দেখতে পাই না। মধ্যবিত্তের সংসার জীবন থেকে শুরু করে মোঘল সম্রাট হুমায়ূনের জীবন-ও তার উপন্যাসের বিষয় হিসেবে উঠে আসতে দেখি। যাত্রা পালার জীবন, চলচ্চিত্রের নায়ক নায়িকার জীবন, সার্কাসের জীবন, নিশিকন্যাদের জীবন থেকে শুরু করে কত কত বিষয় নিয়েই না লেখা সে সব উপন্যাস। সম্প্রতি পড়া “জীবনকৃষ্ণ মেমোরিয়াল হাই স্কুল” উপন্যাসটি এমনই এক বিষয় বৈচিত্র্যে অনন্য। স্কুল নিয়ে লেখা এই উপন্যাসটি আমাকে এক বিশেষ কারণে আকর্ষণ করে।

হুমায়ূন আহমেদের “জীবনকৃষ্ণ মেমোরিয়াল হাই স্কুল” এবং আমার কিছু স্মৃতি

https://bookshelvez.com//Attachments/BookCovers/133.jpg

Copyright © 2025 4i Inc. All rights reserved.