হুমায়ূন_আহমেদের_পেন্সিলে_আঁকা_পরী

আমি যখন আমার বুকশেলফের দিকে তাকাই তখন কেবল শুধু বই কিংবা কালো কালির ছাপানো কতগুলো হরফ দেখি না, আমার মনের মাঝে তখন স্মৃতির ট্রেন চলে। এক লাইন থেকে আরেক লাইনে দুরন্ত গতিতে ছুটে চলা একেকটি ট্রেন দেখি আমি। ধাবমান সেইসব স্মৃতির ট্রেনের সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে আমি  হিমশিম খাই। তবু ক্লান্ত হই না। ভালো লাগে সেইসব স্মৃতির ট্রেনের দিকে তাকিয়ে থাকতে, ট্রেনের জানালায় দেখা যায় কত শত পরিচিত-অপরিচিত মুখ, খুব ভালো লাগে আমার এই সব ট্রেন দেখতে।

যারা পিডিএফ পড়েন আমি মনে করি তারা এই সব স্মৃতি থেকে বঞ্চিত আর যদি থেকেও থাকে তাও সে হাতে গোনা মাত্র। কেননা ভালো নেট স্পীড থাকলে আর কতোই বা সময় লাগে দশটা বই ডাউনলোড করতে? আর সেখানে স্মৃতিরই বা কি স্থান? একটি বই কেনার পেছনে একেকজনের কতো স্মৃতি জমা থাকে। মনে পড়ে একবার আমি “ব্যোমকেশ সমগ্র” কেনার জন্যে খাম বানিয়েছিলাম, তাতে লেখা ছিল- “ইহা কোন ভিক্ষাবৃত্তির উদ্দেশ্যে নয়, কেবলই এক বইপোকার বড় পছন্দের বই কিনিবার নিমিত্তে ব্যবহৃত হয়”, আর আব্বা আসলেই তাঁর সামনে বাড়িয়ে দিতাম দু দশ টাকা পাবার আশায়।

আমি জানি না আমার এইসব স্মৃতি কথা পড়তে কারো ভালো লাগে কিনা। মাঝে মাঝে মনে হয় এইসব ছাইপাঁশ লিখে এবং আপনাদের দিয়ে তা পড়িয়ে বিরক্তিই উৎপাদন করছি কেবল। কিন্তু আমার এইসব স্মৃতিকথা পড়তে ভালো লাগে। গ্রুপগুলোতে যখন দেখি, “কার কি ভালো লাগে, এই তিনটা বইয়ের মাঝে কোনটা পড়ব? অমুক লেখক শ্রেষ্ঠ তমুকের চাইতে কিংবা ফেলুদা গ্রেট নাকি হিমু গ্রেট” টাইপ হাস্যকর পোস্ট তখন আমার এই ধরণের স্মৃতিকথা পড়তে ইচ্ছে হয়। কতো স্মৃতি একেকজনের বই পড়া নিয়ে, বইকে নিয়ে, বইয়ের প্রতি একেকজনের কি প্রগাঢ় ভালোবাসা। ভীষণ ভালো লাগে এই সব পড়তে আমার!

আমার আব্বা তেমন বই পড়েন না (কোরআন শরীফ, ফাযায়েলে আমাল আর ফাযায়েলে সাদাকাত পর্যন্ত তার পড়ার গণ্ডী), তবে আমার বই মানুষকে দেখাতে তিনি খুব ভালবাসেন। আমাকে খুশি করার জন্যে মাঝে মাঝে টাকা পয়সাও দেন। সেবার আমার ৮০০ তম বই উপলক্ষে হাতে ৫০০ টাকার নোট ধরিয়ে দিলেন। আর আমি একমুহূর্ত দেরি না করে শীতের রাতে দৌড় দিলাম বইয়ের দোকানে। আ সং অফ আইস এন্ড ফায়ার সিরিজের তিন নম্বর বই মাত্রই দেখে এসেছি দোকানে, না কিনে কীভাবে থাকি? পত্র ভারতী থেকে একটা সিরিজ প্রকাশ করেছে “সেরা ১০১”নামে, তিন জন লেখকের ১০১টি গল্প নিয়ে প্রকাশ করেছে তারা এই সিরিজটি। তার মাঝে আমার কাছে ছিল কেবল শীর্ষেন্দুর বইটি। সমরেশ মজুমদারের গল্প কেন জানি আমাকে টানেনি, একটি মাত্র গল্পই পড়েছিলাম সমরেশের, গল্পটির নাম ছিল “মাতৃকা”। এতদিন পর বুঝি, গল্পটা ছিল একটা কামিং অভ এজ গল্প। যদিও সুনীলের সবচে নামকরা গল্প “গরম ভাত অথবা নিছক ভূতের গল্প” কিংবা “প্রথম মানবী” তখনও পড়িনি, তাই সুনীলেরটাই কিনে ফেললাম। হাতের কাছেই যেহেতু পুরাতন মার্কেট, ঢুঁ না মেরে কীভাবে থাকি! সেখানে গিয়েই পেয়ে গেলাম হুমায়ূন আহমেদের “পেন্সিলে আঁকা পরী” বইটি। কে যেন পাশে মজা করে লিখে দিয়েছে “কলমে আঁকা পেত্নী”। পড়ে খুব মজা লাগল। কিন্তু কিনতে গিয়ে দেখি পয়সা নাই। দোকানদার বলল- “নিয়ে যান, পড়ে টাকা দিয়ে যাইয়েন”। আহারে এই সব সরল বিশ্বাস মানুষের প্রতি মানুষের কীভাবে আসে!

সময় গড়িয়ে যায়- কতো কতো বই পড়ি কিন্তু “পেন্সিলে আঁকা পরী” আর পড়া হয়ে ওঠে না। বইয়ের পাহাড় জমে ওঠে বুকশেলফের মাঝে। সেদিন হুমায়ূন আহমেদের তাক গোছাতে গিয়ে দেখি “পেন্সিলে আঁকা পরী”টি কেমন নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছে এক কোণায়।

কথাটা আগেও বলেছিলাম, হুমায়ুনের আহমেদের বইতে চরিত্রের ভ্যারিয়েশন খুব কম। তার সব উপন্যসের নায়িকাদের মধ্যে যেমন একই গুণ দেখা যায় (রূপবতী, গুণবতী, চতুরের আধার, তীক্ষ্ণ রসবোধ), ঠিক তেমনই সব নায়কদের মাঝেও একই গুণ থাকে (বেকার, ছন্নছাড়া, হিউমারের খনি, জীবনকে খুবই সিম্পলভাবে দেখার প্রবণতা)। ইফতেখার ভাইয়ের সাথে এই নিয়ে কথা বলার সময় তিনি বলিছিলেন- “আমাদের চারপাশে কি খুব বেশি ভ্যারিয়েশনাল চরিত্র আছে? আমাদের আশেপাশের মানুষগুলো কি একই রকমের না? চরিত্র কি খুব বেশি পাল্টায়?” একভাবে চিন্তা করলে কিন্তু ব্যাপারটা এইই দাড়ায়। মানুষগুলোকে একটু জেনারালাইজ করার চেষ্টা করি- ভালো মানুষ-খারাপ মানুষ, বোকা মানুষ-চালাক মানুষ, দুঃখী মানুষ-সুখী মানুষ, অর্থবান মানুষ-দরিদ্র মানুষ, অহংকারী মানুষ-নিরহংকারী মানুষ, সাহসী মানুষ-দুর্বল মানুষ। আচ্ছা, মানুষের তো এই কয়টা ক্ল্যাসিফিকেশনই হয়, তাই নয় কি? উপন্যাসের চরিত্র বলতে যদি আমরা এসব না বুঝাই কিন্তু মানুষ বলতে তো এদেরই বোঝাবো, তাই নয় কি? আর হুমায়ূন আহমেদ তো মানুষেরই লেখক ছিলেন। গণ মানুষের লেখক। মানুষের স্বভাবের দ্বারা যখন চরিত্রায়ন করা হয় তখন এইসব চরিত্রই উঠে আসে উপন্যাসের পাতায়। তবে “পেন্সিলে আঁকা পরী” অন্যান্য দিক থেকে অনন্য।

মোবারক হোসেন চরিত্রটি শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের “শিউলির গন্ধ” উপন্যাসের পারিজাত চৌধুরীর মতন। নিঃসঙ্গ দৌড়বাজ। যার জীবনে আনন্দ নেই, বিশ্রাম নেই, উপভোগ নেই, আছে কেবল দৌড় আর দৌড়। আপনি যখন দৌড়াবেন তখন একসময় আপনি সবাইকে পিছনে ফেলে যাবেন, আপনার নিকটজন অথবা পর, সব্বাইকে, আপনিই তখন একা দৌড়ে যাবেন। জীবনের সব লক্ষ্যকে ছুয়ে ফেলে তবু ছুটে চলা এক দৌড়বাজের নাম মোবারক হোসেন। মানুষ যখন সব কিছু পায়, বেঁচে থাকা তখন এক অর্থে অর্থহীন হয়ে পড়ে। মোবারক হোসেন জানে তাঁকে বেঁচে থাকতে হলে বিস্মিত হতে হবে, অন্তত এখনও যারা বিস্মিত হতে জানে তাঁদের কাছাকাছি থাকতে হবে। আর তাই তিনি মাঝে মাঝে রাত কাটান বাংলো বাড়িতে অচেনা কোন মেয়ের সাথে যারা টাকার অভাবে যে কোন কিছু করতে পারে। যে কোন কিছু। এমনি এক মেয়ের নাম টেপী।

টেপী সিনেমায় কাজ করে, এক্সট্রা হিসেবে, নায়িকার সাথে জলকেলী করে পুকুরে, সেখানে তার নাম রেশমা। সিনেমাপাড়ায় একটা কথা প্রচলিত আছে যে মেয়ে এক্সট্রা হিসেবে দুবছর কাজ করেও নায়িকার বোন হতে পারে না সে সিনেমাতে সারাজীবন এক্সট্রা হিসেবেই থেকে যাবে। রেশমার ভাগ্য খারাপ সে এখনও নায়িকার বোন হতে পারে নি। ক্লান্ত শরীরে পিতৃহীন এক বাসস্থানের দিকে অগ্রসর হয় সে। “বাসার কাছাকাছি এসেই রেশমা তার শরীর থেকে ছবির নাম মুছে মিতু হয়ে গেল। এখন সে আর রেশমা না, এখন সে মিতু”। মিতু খুব সাধারণ একটা মেয়ে, চেহারা খুব একটা ভালো না, কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ কখনও কোন মেয়েকে অসুন্দর বলেছে তার নজির বিরল। তাই মিতুকে মায়াময়ী হিসেবে উপস্থাপন করেছেন তার এই উপন্যাসে।

হুমায়ূন আহমেদের সব নায়িকাই অসম্ভব রকমের বুদ্ধিমতী হয়। অসম্ভব বলতে অসম্ভব এবং তাঁদের কথার তোড়ে টেকা দায় হয়ে যায় উপন্যাসের পাতায়। কিন্তু কি আশ্চর্য এই বইতে মিতু কী সহজ সরল জীবন্ত! মিতুকে কেবলমাত্র একটি সংলাপেই দেখা যায় হুমায়ুনের অন্যান্য নায়িকার মত করে কথা বলতে! কী সুন্দর প্রাণবন্তভাবেই না এঁকেছেন লেখক হুমায়ূন আহমেদ তার এই এক্সট্রা চরিত্রটিকে, কতো মমতা দিয়ে! এই একটি মেয়ে তিন মেয়ের ভূমিকায় অভিনয় করে। আর অভিনয় করে করে যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে তখন রাতের আঁধারে সবার অলক্ষ্যে কী করুণ কান্না তার!

মবিন এই উপন্যাসের নায়ক। মিতুর বড় ভাইয়ের বন্ধু। মিতুর বড় ভাই, রফিক, জেলে গিয়েছে মানুষ খুনের অপরাধে, কিন্তু কেন সে মানুষ খুন করল তার বর্ণনা নেই বইতে। ব্যাপারটা আমাকে ভিক্টর হুগো’র “দ্য ম্যান হু লাফস” বইটার কথা মনে করিয়ে দিল। উর্সাস কে, কি তার পরিচয়, কীভাবে সে এই অঞ্চলে এসেছিল তা জানা যায় না। লেখক ইচ্ছাকৃত ভাবেই তা এড়িয়ে গেছেন। এক রহস্যময়তায় মোড়া, যেন লেখক জানাতে চায় না সেই রহস্যটি। রফিকের ইতিহাসও এখানে লেখক হুমায়ূন আহমেদ জানাতে চাননি। তাই সমগ্র উপন্যাসে তেমন একটা না থেকেও বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটা চরিত্র রফিক। মবিন হুমায়ূনের অপরাপর প্রেমের উপন্যাসের নায়কের মতই বেকার, কিন্তু ছন্নছাড়া নয়।

বইয়ের বেশ কয়েকটি দৃশ্য মনে রাখার মত। তার মাঝে অন্যতম হল মায়ের সাথে রাগ করে মিতুর ছোট বোন ঝুমুরের বারান্দায় এসে বসা দৃশ্যটি। একজন তার সকল দুঃখের প্রদীপ নিয়ে বসেছে প্রকৃতির কাছে। তার সব দুঃখ- সংসারের সমস্ত যাতনা প্রকৃতির সাথে ভাগ করে নিতে বসেছে। কী মায়াময় করেই না সে দৃশ্যের বর্ণনা করেছেন লেখক!

হুমায়ূনী ভুল ভ্রান্তি এখানেও চোখে পড়ে। এক জায়গায় ঝুমুর তার কাল্পনিক স্বামীর সাথে তুমি করে কথা বললেও দুই পৃষ্ঠা পড়ে আপনি করে কথা বলা শুরু করে। আবার দরজির দোকানের কর্মচারীর নাম প্রথমে শহীদ বললেও পড়ে শাহেদ হয়ে যায়। মোবারক হোসেনের প্রতিটি বসার ঘরের এতো ডিটেইল বর্ণনা লেখক কেন দিয়েছেন তা বোঝা গেল না।

হুমায়ূন আহমেদের স্বাভাবিক কৌতুক মেজাজের লেখা এই উপন্যাসে দেখা যায় না বরঞ্চ তার বদলে বেশ সিরিয়াস একটা ভঙ্গি দেখতে পাই। যেমন দেখা গিয়েছিল “জনম জনম”, “সবাই গেছে বনে”, “নন্দিত নরকে”, “শঙ্খনীল কারাগার” প্রভৃতি বইতে। সেদিন এক গ্রুপে লেখা দেখলাম- “হুমায়ূন আহমেদ যে একজন অসাধারণ লেখক ছিলেন তা জানার জন্যে কি নন্দিত নরকে যথেষ্ট নয়?” আমি বলবো, যথেষ্ট নয়। একজন লেখকের এতো এতো লেখার মধ্যে কেবল একটা লেখাকে দেখে লেখক হিসেবে তিনি সেরা, অসাধারণ প্রভৃতি বাক্যালংকার প্রয়োগ করে কোন উপসংহার টানতে আমি রাজি নই। আমি বলব- নন্দিত নরকের সাথে পেন্সিলে আঁকা পরীকেও যুক্ত করা উচিত।

উপন্যাসটির শেষ প্যারা না থাকলে “পেন্সিলে আঁকা পরী” এতো সুন্দর একটা রোম্যান্টিক উপন্যাস হতো না। আর তাই কেন জানি মনে হয় লেখক ইচ্ছে করেই শেষ প্যারাটি লিখেছিলেন, যেন তিনি চাইছিলেন কালো শ্যামলা মতন একটি জনম দুঃখী মেয়ে গায়ের রঙের সাথে বেমানান বেগুনি রঙের শাড়ি পড়ে ভালোবাসার মানুষটির হাত ধরুক। কলমের জোড়ে দুঃখী একটি মেয়েকে সুখী করিয়ে দেবার এই প্রবনতায় যখন আমরা উৎসর্গ পত্রের দিকে তাকাই তখন হোঁচট খাই। সন্দেহ হয়, তবে কি পরিচালক হুমায়ূন আহমেদের কোন পরিচিত এক্সট্রা মেয়েকে ঘিরেই লেখক হুমায়ূন আহমেদ উপন্যাসের পাতায় এঁকেছিলেন তার এই পেন্সিলে আঁকা পরীকে।

সবাইকে ধন্যবাদ।

হুমায়ূন আহমেদের "পেন্সিলে আঁকা পরী"

https://bookshelvez.com//Attachments/BookCovers/116.jpg
https://bookshelvez.com//Attachments/BookCovers/116.jpg

আমি যখন আমার বুকশেলফের দিকে তাকাই তখন কেবল শুধু বই কিংবা কালো কালির ছাপানো কতগুলো হরফ দেখি না, আমার মনের মাঝে তখন স্মৃতির ট্রেন চলে। এক লাইন থেকে আরেক লাইনে দুরন্ত গতিতে ছুটে চলা একেকটি ট্রেন দেখি আমি। ধাবমান সেইসব স্মৃতির ট্রেনের সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে আমি হিমশিম খাই। তবু ক্লান্ত হই না। ভালো লাগে সেইসব স্মৃতির ট্রেনের দিকে তাকিয়ে থাকতে, ট্রেনের জানালায় দেখা যায় কত শত পরিচিত-অপরিচিত মুখ, খুব ভালো লাগে আমার এই সব ট্রেন দেখতে।

হুমায়ূন আহমেদের "পেন্সিলে আঁকা পরী"

https://bookshelvez.com//Attachments/BookCovers/116.jpg

Copyright © 2025 4i Inc. All rights reserved.