হুমায়ূন আহমেদের বেশ কিছু বই আমি পড়িনি। এমন নয় যে, সেসব বই পড়ার সুযোগ আমার হয়নি। হয়েছে, কিন্তু আমি ইচ্ছে করেই পড়িনি। যেমনটা পড়ি না শহীদুল জহিরের কিছু গল্প, ইলিয়াসের খোয়াবনামা ইত্যাদি ইত্যাদি। এর পেছনে “পড়লেই শেষ হয়ে যাবে” এরকম একটা লেইম ধারণা মনের ভেতর থাকলেও কেন জানি এই লেইম জিনিসটাকেই ভালো লাগে। থাক না, কিছু বই এরকম অপঠিত অবস্থায়। যখন কোন কিছুই পড়তে ভালো লাগবে না তখন না হয় এই বইগুলো পড়া যাবে আস্তে, ধীরে।
.
এরকম করে করে এইবার হুমায়ূন আহমেদের “পুফি” বইটা পড়া হল। “পুফি” সম্ভবত হুমায়ূন আহমেদের মিসির আলি বিষয়ক সর্বশেষ বই। এবং বইয়ের শুরুতেই বেশ দৃঢ় ভাষায় লেখা রয়েছে যে, এই বইয়ের এমন “কিউট” নাম দেখে কোন অভিভাবক যেন ঘুণাক্ষরেও এই বই কোন বাচ্চার হাতে তুলে না দেন। কারণ এই বইতে বাচ্চাদের বোধগম্য নয় অথচ বাচ্চাদের মানসিকতায় খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে এমন অনেক কিছু রয়েছে। অথচ মজার ব্যাপার হল এই বইয়ের বিশাল একটা জায়গা জুড়ে রয়েছে ছোট্ট একটা মেয়ে। বইয়ের বাচ্চা যদি এইরকম খারাপ জিনিস প্রত্যক্ষ করতে পারে তাহলে বাস্তবের বাচ্চা সেটা সহ্য করতে পারবে না কেন? বইয়ের বাচ্চা আসল বাচ্চা নয় বলে?
.
গল্প আবর্তিত হয়েছে আবুল কাশেম জোয়ার্দারকে ঘিরে, যার বাসায় পুফি নামের একটা বিড়াল রয়েছে। ছোটবেলায় পশু-পাখি বিষয়ক তিক্ত অভিজ্ঞতা থাকায় আবুল কাশেম সাহেব এইসব প্রাণী একদমই সহ্য করতে পারেন না। কিন্তু আবুল কাশেম সাহেবের ছোট্ট মেয়ে অনিকা যখন বাসায় পুফি বিড়ালটি নিয়ে আসে তখন থেকেই ঝামেলার শুরুটা হয়। দেখা যায় বিড়ালটি বাসায় না থাকলেও বিড়ালটিকে এখানে সেখানে দেখতে পান তিনি। আরও অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে বিড়ালটির ছবি তুললে তার আশেপাশের সব জিনিসের ছবি উলটো হয়ে যায়, যেন মনে হয় ছবিটি আয়নার ভেতর দিয়ে তোলা হয়েছে। রহস্য ক্রমশই ঘনীভূত হতে থাকে।
.
শ্রোডিঙ্গারের বেড়ালের দুইটি রিয়্যালিটি আছে। একই সাথে বিড়ালটি জীবিত আবার সে মৃত। এখন আপনি কোন রিয়্যালিটি গ্রহণ করবেন সেটা একান্তই আপনার ইচ্ছা। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি কোন রিয়্যালিটি বেছে না নেবেন ততক্ষণ পর্যন্ত বিড়ালটি একই সাথে জীবিত ও মৃত। শ্রোডিংগারের বিড়ালের মতনই আমাদের পুফি একই সাথে দুই জগতে অবস্থান করে, এখন আপনাকে বেছে নিতে হবে যে কোন একটা জগত। মজার ব্যাপার হচ্ছে দুই জগতই কিন্তু সত্য।
.
“পুফি” বই নিয়ে বিশেষ কিছু বলার নেই। তবে এই বইয়ের রাইটিং ফর্ম নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। যেটা আমার কাছে খুবই চমৎকার লেগেছে। পড়তে পড়তে বেশ কয়েকবারই ধন্ধে পড়ে গিয়েছিলাম, কোনটা সত্যি আর কোনটি মিথ্যা। আদৌ আমি ঠিকভাবে পড়েছি কিনা, কিছু মিস করে গেলাম কিনা। যখন নিজেকেই নিজের কাছে পাগল পাগল লাগবে তখন বুঝতে পারবেন কী অসাধারণ একটা লেখা পড়ছেন আপনি। মিসির আলি যদিও খুব সামান্য সময়ের জন্যে এই বইতে উপস্থিত হয়েছেন কিন্তু তাতেই তিনি বেশ চমৎকার খেল দেখিয়েছেন।
.
তবে বইটি নিয়ে সামান্য আক্ষেপ অনুযোগ রয়েছে। আমার নিজের কাছে মনে হয়েছে হুমায়ূন আহমেদ ইচ্ছে করলেই আরও খেলাতে পারতেন পাঠকদের নিয়ে। তাতে পাঠকের হয়তো কিছুটা সমস্যা হত, তবে নিঃসন্দেহে কিছু পাঠকেরা সেটা বেশ উপভোগও করত। বইয়ের কিছু কিছু ঘটনা “নিষাদ” বইয়ের অনুরূপ হয়ে গিয়েছে। অন্য রিয়্যালিটি থেকে পেপার আনা, ছবি আনা ঘটনাগুলো পড়ে “নিষাদ” বইয়ের কথা মনে পড়ে যায়। বেশি লিখলে এরকম হওয়ার কথা শিব্রাম বলে গেছেন।
.
হুমায়ূন আহমেদের মতন এমন ভার্সেটাইল লেখক এই বাংলায় দ্বিতীয় জন জন্মেছিলেন কিনা সন্দেহ আছে। কত অদ্ভুত অদ্ভুত বিষয় নিয়েই না লিখেছেন তিনি। আর তার লেখার এমনই সম্মোহনী গুণ যে সেইসব অদ্ভুত লেখা পাঠকেরা বুঝুক কিংবা না বুঝুক পড়ে গিয়েছে মন্ত্রমুগ্ধের মতন। আমরা হুমায়ূন আহমেদের মধ্যবিত্তীয় আবেগ সর্বস্ব লেখার অনুকরণে প্রচুর লেখা এবং লেখক দুই-ই পেয়েছি হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকা অবস্থাতেও আবার তার মৃত্যুর পরেও। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের মতন এমন বিচিত্র বিষয় নিয়ে লেখা একজনের কাছ থেকেও পাইনি। কারণটা সম্ভবত এই যে, মধ্যবিত্তের প্যানপ্যানানিয়া সস্তা আবেগ নিয়ে লিখতে গেলে পড়াশোনা লাগে না কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের ওই সব লেখা লিখতে গেলে লাগে গভীর জ্ঞান। হুমায়ূন আহমেদের মতন এমন বিচিত্র বিষয় নিয়ে লিখবেন এমন একজন লেখক জন্মাবার আশাবাদ নিয়ে সবাইকে আমন্ত্রণ জানালাম “পুফি” বইটি পড়বার।
.
সবাইকে ধন্যবাদ।
হুমায়ূন আহমেদের “পুফি”
Mehedie Hassan https://bookshelvez.com//Attachments/BookCovers/209.pngগল্প আবর্তিত হয়েছে আবুল কাশেম জোয়ার্দারকে ঘিরে, যার বাসায় পুফি নামের একটা বিড়াল রয়েছে। ছোটবেলায় পশু-পাখি বিষয়ক তিক্ত অভিজ্ঞতা থাকায় আবুল কাশেম সাহেব এইসব প্রাণী একদমই সহ্য করতে পারেন না। কিন্তু আবুল কাশেম সাহেবের ছোট্ট মেয়ে অনিকা যখন বাসায় পুফি বিড়ালটি নিয়ে আসে তখন থেকেই ঝামেলার শুরুটা হয়। দেখা যায় বিড়ালটি বাসায় না থাকলেও বিড়ালটিকে এখানে সেখানে দেখতে পান তিনি। আরও অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে বিড়ালটির ছবি তুললে তার আশেপাশের সব জিনিসের ছবি উলটো হয়ে যায়, যেন মনে হয় ছবিটি আয়নার ভেতর দিয়ে তোলা হয়েছে। রহস্য ক্রমশই ঘনীভূত হতে থাকে।
হুমায়ূন আহমেদের “পুফি”
https://bookshelvez.com//Attachments/BookCovers/209.png